সর্বশেষ সংবাদ
লামিয়া আর্জুমাদ:
সকালের নরম রোদে গ্রামের চায়ের দোকানটা তখন ধীরে ধীরে ভরে উঠছে। কেউ কাজে যাওয়ার আগে এক কাপ চা, কেউবা বাজারে যাওয়ার পথে একটু বিশ্রাম। এমন সময় কয়েকজন মানুষ একটি মোবাইল ফোন ঘিরে দাঁড়িয়ে পড়লেন। পর্দায় ভেসে উঠল এক ব্যক্তির ছবি।
একজন বললেন, "এই লোকটা তো একেবারে আমাদের পাশের গ্রামের মানুষের মতো।" একটু থেমে আরেকজন সন্দেহের সুরে জবাব দিলেন, "না রে, এটা আসল না। এখন নাকি এআই দিয়ে এসব বানানো যায়।"
এই ছোট্ট দৃশ্যটাই বোঝায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন আর শহরের সীমার মধ্যে আটকে নেই। ধীরে ধীরে তা পৌঁছে গেছে গ্রামবাংলার চায়ের দোকান, বাজার আর আড্ডায়।
প্রযুক্তির পথচলা আর গ্রামের মানুষ: এক সময় গ্রামের মানুষের কাছে প্রযুক্তি বলতে ছিল রেডিও। সন্ধ্যায় খবর শোনার জন্য সবাই জড়ো হতেন। পরে টেলিভিশন এলো, বদলে গেল বিনোদন আর তথ্য পাওয়ার ধরন। এরপর মোবাইল ফোন গ্রামীণ জীবনে তৈরি করল এক নতুন বাস্তবতা।
এখন সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে আরেকটি শব্দ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। গ্রামের অনেকেই হয়তো "Artificial Intelligence" শব্দটির মানে জানেন না কিংবা ব্যাখ্যা করতে পারবেন না। কিন্তু তারা জানেন, এর মাধ্যমে এখন এমন ছবি বানানো যায় যেখানে মানুষ কখনো না যাওয়া জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, এমন কথা বলছে যা সে কখনো বলেনি।
সত্য আর কৃত্রিমের সীমারেখা: আজ গ্রামের মানুষও ফেসবুক, ইউটিউব কিংবা হোয়াটসঅ্যাপে ছবি, ভিডিও আর খবর দেখেন। নানাবিধ খবর শেয়ার করেন। এর বড় একটি অংশই এখন তৈরি হচ্ছে এআইয়ের মাধ্যমে। ফলে বাস্তব আর কৃত্রিমের পার্থক্য আগের মতো স্পষ্ট থাকছে না।
অনেকেই বলছেন, "আগে ছবি দেখলেই বিশ্বাস হতো। এখন আর সহজে বিশ্বাস হয় না। এই কথার ভেতরেই লুকিয়ে আছে পরিবর্তনের ইঙ্গিত। ছবি আর ভিডিও দেখলেই মানুষ এখন আর তা অন্ধভাবে বিশ্বাস করেন না। শহরের মতো গ্রামের মানুষেরও প্রযুক্তি বিষয়ে জানাশোনা বেড়েছে। জীবন মানের পাশাপাশি বিকাশ ঘটেছে মানুষের চিন্তারও।
তবে এআই দিয়ে তৈরি অনেক ছবি, ভিডিও এতটাই বাস্তবসম্মত হয় যে প্রথম দেখায় বোঝার উপায় থাকে না। তবে একটু মনোযোগ দিলে সহজেই কিছু অসংগতি চোখে পড়ে। কোথাও মানুষের হাতের আঙুল অস্বাভাবিক, চোখের দৃষ্টি ঠিক নেই, মুখ অতিরিক্ত নিখুঁত। আবার পরিচিত গ্রামের পরিবেশে এমন কিছু বসানো থাকে, যা বাস্তবে কখনো ছিল না। আশেপাশের দোকানের সাইনবোর্ডে লেখা থাকে এলোমেলো বা ভুল। এই লক্ষণগুলো খেয়ালের মাধ্যমে গ্রামের সাধারণ মানুষও ধীরে ধীরে বুঝতে শিখছেন কোনটা আসল, আর কোনটা বানানো।
ভুয়া খবরের ঝুঁকি: এআইয়ের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো ভুয়া খবর। গ্রামে এখনো মুখে মুখে খবর ছড়ানোর প্রবণতা থাকলেও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ফলে কোনো ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য খুব দ্রুত চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে ও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে।
কখনো বলা হয় কোনো রোগের সহজ চিকিৎসার কথা, কখনো ছড়ানো হয় ভয়ের গুজব, আবার কখনো ধর্ম বা রাজনীতি নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য। অনেক সময় মানুষ ভালো উদ্দেশ্যে নিয়ে এসব খবর শেয়ার করলেও বুঝতে পারেন না, খবরটি সত্য নয়।
তবে ভুয়া খবর থেকে বাঁচতে খুব জটিল কিছু করার দরকার নেই। এরজন্য দরকার একটু সচেতনতা ও কিছু বিষয় খেয়াল রাখা। যেমন- খবর শেয়ার করার আগে উৎস দেখা, একাধিক জায়গায় মিলিয়ে নেওয়া, আর প্রয়োজনে গ্রামের শিক্ষক, ইমাম বা সচেতন কারও সঙ্গে আলোচনা করলেই অনেক ক্ষতি এড়ানো যায়।
সচেতন ব্যবহারের সুফল: এআই মানেই প্রতারণা নয়। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি গ্রামের মানুষের জন্য বড় সহায়কও হতে পারে। গ্রামীণ জীবনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব এখন বহুমাত্রিক। কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা সবখানেই নতুন সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে।
কৃষি গ্রামীণ অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি। এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে মাটির গুণগত মান বিশ্লেষণ, আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং ফসলের রোগ আগেভাগে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে কৃষকরা সঠিক সময়ে সেচ দিতে পারেন, সার ও ওষুধ ব্যবহার করতে পারেন। এতে খরচ কমে, ঝুঁকি কমে এবং উৎপাদন বাড়ে।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও এআই নতুন পথ দেখাচ্ছে। গ্রামে ভালো চিকিৎসা পাওয়া এখনো অনেকের জন্য কঠিন। টেলিমেডিসিন ও এআই-ভিত্তিক অ্যাপের মাধ্যমে মানুষ ঘরে বসেই প্রাথমিক স্বাস্থ্যপরামর্শ নিতে পারছেন। এতে সময় ও অর্থ দুটোই সাশ্রয় হচ্ছে।
শিক্ষার ক্ষেত্রেও এআই নতুন সুযোগ তৈরি করছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে গ্রামীণ শিক্ষার্থীরা এখন নিজের গতিতে পড়াশোনা করার সুযোগ পাচ্ছে।
প্রশ্নের আলোয় বিভ্রান্তি দূর: সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন প্রযুক্তিকে প্রশ্ন না করে অন্ধভাবে বিশ্বাস করা হয়। তবে আশার কথা হলো, গ্রামীণ সমাজে এখন সেই প্রশ্ন তোলার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে।
গ্রামের মানুষ কখনোই পরিবর্তনকে ভয় পায়নি। রেডিও থেকে টেলিভিশন, টেলিভিশন থেকে মোবাইল, প্রতিটি পরিবর্তনের সঙ্গেই তারা মানিয়ে নিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেই দীর্ঘ পথচলারই পরের ধাপ।
আজ গ্রামে ছবি দেখেই সবাই বিশ্বাস করে না, খবর পেয়েই শেয়ার করে না। মানুষ থেমে ভাবছে, প্রশ্ন করছে, মিলিয়ে দেখতে চাইছে। এই থামা, এই প্রশ্ন করাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। কারণ প্রযুক্তি যত দ্রুত এগোয়, তার চেয়েও জরুরি হলো মানুষ কতটা সচেতনভাবে তার সঙ্গে হাঁটতে পারে। সেই সচেতনতার চর্চাই হয়তো গ্রামবাংলাকে এআইয়ের সময়ে নিরাপদ রাখবে, আর একই সঙ্গে খুলে দেবে নতুন সম্ভাবনার দরজাও।
সময় জার্নাল/এসএস
Somoy Journal is new coming online based newspaper in Bangladesh. It's growing as a most reading and popular Bangladeshi and Bengali website in the world.
উপদেষ্টা সম্পাদক: প্রফেসর সৈয়দ আহসানুল আলম পারভেজ
কপিরাইট স্বত্ব ২০১৯-২০২৬ সময় জার্নাল