বুধবার, ১৮ মার্চ ২০২৬

রমজান শেষে খুশির ঈদ: তরুণদের কথায় উৎসবের আবেগ

বুধবার, মার্চ ১৮, ২০২৬
রমজান শেষে খুশির ঈদ: তরুণদের কথায় উৎসবের আবেগ

রমজানের এক মাস সিয়াম সাধনার পর শাওয়ালের নতুন চাঁদ দেখা দিলেই বয়ে যায় আনন্দের ঢেউ। ঈদুল ফিতর শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি ভালোবাসা, সম্প্রীতি ও মিলনের এক অনন্য উপলক্ষ। নতুন পোশাকের আনন্দ, ঈদের নামাজ, প্রিয়জনের সঙ্গে কোলাকুলি আর পরিবারের মিলনমেলা—সব মিলিয়ে ঈদ হয়ে ওঠে আবেগ ও আনন্দে ভরা এক বিশেষ মুহূর্ত। এই আনন্দের আবহকে আরও গভীর করে তোলে কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই কালজয়ী গান-“ও মোর রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ”।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঈদকে ঘিরে এমনই অনুভূতি, স্মৃতি ও ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন... তানজিল কাজী


রমাদান, চাঁদ আর ঈদের ভালোবাসা

ঈদ মানেই আনন্দ, ভালোবাসা আর নতুন শুরুর এক মায়াবী অনুভূতি। রমজানের এক মাসের সংযম, ধৈর্য আর আত্মশুদ্ধির পর ঈদের সকাল যেন এক স্বচ্ছ আলোয় ভরা শান্তির বার্তা নিয়ে আসে। ভোরের নরম আলো, মসজিদের তাকবিরের ধ্বনি আর নতুন পোশাকের গন্ধ—সব মিলিয়ে ঈদের সকাল যেন এক আলাদা সৌন্দর্যে ভরা মুহূর্ত।

ঈদের দিনটিতে মানুষের হৃদয় একটু বেশি কোমল হয়ে ওঠে। সবাই ভুলে যেতে চায় পুরোনো কষ্ট, অভিমান আর দূরত্ব। ছোটরা নতুন পোশাক পরে খুশিতে মেতে ওঠে, আর বড়রা তাদের হাসিতে খুঁজে পায় জীবনের সবচেয়ে নির্মল আনন্দ। ঈদের নামাজ শেষে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে বলা “ঈদ মোবারক” কথাটি যেন শুধু একটি শুভেচ্ছা নয়, বরং ভালোবাসা আর বন্ধনের এক গভীর প্রকাশ।

ঈদের আরেকটি সুন্দর দিক হলো পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের একত্র হওয়া। ঘরে ঘরে রান্না হয় সেমাই, পায়েস আর নানা রকমের মজার খাবার। সবার সঙ্গে বসে খাওয়া, গল্প করা আর স্মৃতির ঝুলি খুলে বসা—এসব ছোট ছোট মুহূর্তই ঈদের আসল আনন্দ তৈরি করে। এই দিনে ধনী-গরিবের ভেদাভেদ ভুলে সবাই একসঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার চেষ্টা করে।

ঈদ শুধু উৎসব নয়, এটি কৃতজ্ঞতারও একটি সময়। আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং ভালোবাসা ছড়িয়ে দেওয়ার মধ্যেই ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে।


সামিহা সিরাজী লাজ
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


আমার ঈদের আনন্দের হালচাল

রমজানের বিদায়ী বেলায় শাওয়ালের চাঁদ যেন বয়ে আনে অফুরান আনন্দের বার্তা। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদুল ফিতর আমাদের জীবনে ফিরে আসে নতুন সাজে, নতুন উদ্যমে। এই ঈদ আমার কাছে শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি পুরোনো দিনে ফিরে যাওয়া, শিকড়ের সন্ধান পাওয়া এবং ঐতিহ্যের সঙ্গে নিজেকে মেলে ধরার এক অনন্য সুযোগ।

আমার ঈদ শুরু হয় খুব ভোরে। শখের নতুন পাঞ্জাবি পরে ঈদের নামাজে যাওয়া, পরিচিতদের সঙ্গে কোলাকুলি ও ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়—এই দৃশ্যগুলো মনকে ভরে দেয় পরিতৃপ্তিতে। তবে এই আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা ভাগ করে নেওয়া হয়। পরিবারের ছোটদের সালামি দেওয়া আর বড়দের কাছ থেকে সালামি নেওয়ার মধ্য দিয়ে সম্পর্কের এক মধুর বন্ধন তৈরি হয়। ফেসবুকে নতুন পাঞ্জাবির ছবি আপলোড না করলে আধুনিক এই প্রজন্মের ঈদ যেন জাঁকজমক পায় না! আর মায়ের হাতে বানানো সেমাই খাওয়া তো ঈদের অপরিহার্য অনুষঙ্গ।

ইতিহাস বলছে, প্রায় ৫০০ বছর আগে মুঘল আমলে সুবেদার ইসলাম খাঁ চিশতীর সময় থেকে এই মিছিলের সূচনা। ১৬১০ সালে ঢাকা যখন মুঘল রাজধানী হয়, তখন থেকেই জাঁকজমকপূর্ণভাবে ঈদ উদযাপনের রেওয়াজ চলে আসছে।

মুঘল সম্রাটরা হাতির পিঠে চড়ে, বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে ঈদগাহে যেতেন। পরবর্তীতে নায়েব-নাজিমদের সময়ও এই মিছিল সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের প্রতীক হয়ে ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় গত বছরের সাফল্যের পর এবারও রাজধানীতে বসছে জমকালো আয়োজন। ঈদ আনন্দ মিছিল উদযাপন কমিটি–২০২৬ ইতিমধ্যে তিনদিনব্যাপী উৎসবের ঘোষণা দিয়েছে, যেখানে ঈদের দিন সকালে জাতীয় ঈদগাহ প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার হয়ে শাহবাগ পর্যন্ত মিছিলটি যাবে। শিশু-কিশোরদের জন্য কিডস জোন, পাড়া-মহল্লার ঝটিকা মিছিলের প্রতিযোগিতা সব মিলিয়ে যেন উৎসবে মেতে উঠবে পুরো শহর।

এই আয়োজন প্রমাণ করে, ঈদ শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক আনন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার বিষয় নয়। এটি আমাদের শেকড়ের সন্ধান দেয়, ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের যোগসূত্র তৈরি করে। পুরোনো দিনের সেই হাতির পিঠের জাঁকজমক না থাকলেও লক্ষ কণ্ঠের “ঈদ মোবারক” ধ্বনি আজও সৃষ্টি করে এক অবর্ণনীয় ঐক্যের বোধ। এই আনন্দের স্রোতে গা ভাসিয়ে দেওয়াই হলো ঈদকে সার্থক করে তোলার আসল উপায়।
ঈদ মোবারক!

আশিক মাহমুদ
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


রমাদান, মূল্যবোধ ও শৈশবের স্মৃতি

রমজানের দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর উদযাপিত হয় ঈদ। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও মানবিক মূল্যবোধ চর্চার মাধ্যমে পালিত হয় ঈদ। ঈদ বয়ে আনে অনাবিল আনন্দ, শিশুর মুখে হাসি এবং সকল মানুষের জীবনে এক অফুরন্ত খুশি।সবাই মিলে নতুন চাঁদ দেখার মাধ্যমে শুরু হয় ঈদের প্রথম প্রহর। এই আনন্দের মুহূর্তে টেলিভিশন ও রেডিওতে বেজে ওঠে“ও মোর রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ,তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানি তাগিদ।”ছোট, বড়, বৃদ্ধা, বনিতা—সকলের হাত রাঙা হয় মেহেদির নকশায়। ঈদের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো, এই দিনে খুব সকালে ঘুম ভাঙে মায়ের স্নেহভরা কণ্ঠে। ঘরে ঘরে প্রস্তুত হয় পায়েস, সেমাইসহ বাহারি রকমের নাস্তা ও খাবার।

ছোট ছোট বাচ্চারা নতুন পোশাক পরে একরাশ হাসি নিয়ে বাবাদের হাত ধরে যায় ঈদগাহে। ‘আল্লাহু আকবার’ তাকবিরের প্রতিধ্বনিতে পালিত হয় ঈদের নামাজ। সকলে একই ভ্রাতৃত্ব, রহমত ও নাজাতের ছায়ায় মিলিত হয়।
নামাজ শেষে প্রতিটি মানুষের আলিঙ্গনে “ঈদ মোবারক” শব্দটি হয়ে ওঠে ভালোবাসা, স্নেহ ও ভ্রাতৃত্বের প্রতীক এবং ঘুচে যায় সকল হিংসা-বিদ্বেষ। পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের মেলবন্ধনে ঈদ হয়ে ওঠে খুশির সম্ভার।ঈদ মনে শুধু আনন্দই নয়, কিছু মানুষের কাছে এটি বিষণ্ন আবেগের বিষয়ও হয়ে ওঠে। নববধূ চেয়ে থাকে তার পরিবারে ফেরার আশায়, প্রবাসীদের ঈদ কাটে একাকিত্বে, বিধবার ঈদ কাটে অনিশ্চয়তায়, এতিমরা চেয়ে থাকে আপনজনের আশায়।

এসব আর্তনাদকে পেছনে ফেলে সীমাহীন আনন্দ, সহমর্মিতা ও আত্মশুদ্ধির মধ্য দিয়ে পালিত হয় ঈদ। ঈদ মানে ধনী-গরিব নির্বিশেষে সকল ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করা।তাই ঈদের আমেজ ছড়িয়ে পড়ুক সকল স্তরে, প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে। আত্মশুদ্ধি, ত্যাগ ও কৃতজ্ঞতার মাধ্যমে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে কল্যাণ বয়ে আনুক—এটাই হোক ঈদের প্রকৃত অর্জন।

সিরাজুম মুনিরা রিংকী
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


শিক্ষাজীবনে ঈদের অন্যতম আকর্ষণ “সালামি”

ঈদ শিক্ষার্থীদের জীবনে এক অন্যরকম আনন্দের নাম। বছরের ব্যস্ত পড়াশোনা, পরীক্ষা আর ক্লাসের চাপের মাঝে ঈদ যেন এক প্রশান্তির ছুটি নিয়ে আসে।

রমজানের শেষ দিকে চাঁদ দেখা গেলেই শিক্ষার্থীদের মনে শুরু হয় উচ্ছ্বাস—কবে আসবে সেই কাঙ্ক্ষিত ঈদের দিন!

ঈদের আগে নতুন পোশাক কেনা শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ আনন্দের বিষয়। নিজের পছন্দের জামা, জুতা বা পাঞ্জাবি বেছে নেওয়ার মধ্যেই তারা খুঁজে পায় আলাদা এক উত্তেজনা। অনেকেই বন্ধুদের সঙ্গে মিলিয়ে পোশাক কিনে, যাতে ঈদের দিন একসঙ্গে ছবি তুলতে পারে—এ যেন বন্ধুত্বেরও এক সুন্দর উদযাপন।

ঈদের সকালে নতুন পোশাক পরে নামাজে যাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য এক গর্বের মুহূর্ত। নামাজ শেষে বন্ধুদের সঙ্গে কোলাকুলি, “ঈদ মোবারক” বিনিময়—এসব মুহূর্ত তাদের হৃদয়ে থেকে যায় দীর্ঘদিন।এরপর শুরু হয় বাড়ি বাড়ি ঘোরা, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করা এবং মজার মজার খাবার খাওয়া।শিক্ষার্থীদের কাছে ঈদের আরেকটি বড় আকর্ষণ হলো সালামি। বড়দের কাছ থেকে পাওয়া এই ছোট্ট উপহার তাদের আনন্দকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। কেউ সেই টাকা জমায়, কেউ আবার পছন্দের কিছু কিনে নেয়—প্রতিটি মুহূর্তই হয়ে ওঠে আনন্দময়।

তবে শুধু আনন্দ নয়, ঈদ শিক্ষার্থীদের শেখায় ভাগাভাগি করার মূল্যও। গরিব সহপাঠী বা আশেপাশের অসহায় মানুষের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমে তারা মানবিকতা ও সহমর্মিতার শিক্ষা পায়।সব মিলিয়ে, শিক্ষার্থীদের জীবনে ঈদ শুধু একটি উৎসব নয়; এটি একগুচ্ছ স্মৃতি, ভালোবাসা আর বন্ধুত্বের রঙিন অধ্যায়, যা তাদের মনকে করে তোলে উজ্জ্বল ও আনন্দে ভরপুর।

মো: দিদার হোসেন
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সময় জার্নাল/একে


Somoy Journal is new coming online based newspaper in Bangladesh. It's growing as a most reading and popular Bangladeshi and Bengali website in the world.

উপদেষ্টা সম্পাদক: প্রফেসর সৈয়দ আহসানুল আলম পারভেজ

যোগাযোগ:
এহসান টাওয়ার, লেন-১৬/১৭, পূর্বাচল রোড, উত্তর বাড্ডা, ঢাকা-১২১২, বাংলাদেশ
কর্পোরেট অফিস: ২২৯/ক, প্রগতি সরণি, কুড়িল, ঢাকা-১২২৯
ইমেইল: somoyjournal@gmail.com
নিউজরুম ই-মেইল : sjnewsdesk@gmail.com

কপিরাইট স্বত্ব ২০১৯-২০২৬ সময় জার্নাল