শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬

নিম্নবিত্তের জীবনে সুখের সংজ্ঞা

শনিবার, মার্চ ২৮, ২০২৬
নিম্নবিত্তের জীবনে সুখের সংজ্ঞা

তাসনিম জাহান খুশবু:
‎সুখ এমন একটি শব্দ, যার পেছনে পৃথিবীর সকল মানুষ নিরন্তর ছুটে চলে। তবে এই শব্দটির অর্থ সকলের কাছে এক নয়। জীবনের অবস্থান, আর্থিক অবস্থা, পারিবারিক পরিবেশ এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সুখের সংজ্ঞাও বদলে যায়। ধনীদের কাছে যেখানে সুখ মানে আরাম-আয়েশ, বিলাসিতা ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, সেখানে নিম্নবিত্ত মানুষের কাছে সুখের অর্থ অনেক সহজ, অনেক বাস্তব এবং অনেক বেশি অনুভবের। তারা সুখ খোঁজে বড় স্বপ্নে নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট প্রাপ্তির মাঝেই।
‎নিম্নবিত্ত মানুষ প্রতিদিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জীবন যাপন করে। তাদের জীবনের প্রতিটি দিন যেন নতুন একটি যুদ্ধ। সকাল শুরু হয় জীবিকার চিন্তায়, আর রাত শেষ হয় পরদিনের ভাবনায়। তবুও এই কঠিন বাস্তবতার মাঝেও তারা সুখ খুঁজে নিতে জানে। একবেলা পেট ভরে খেতে পারা, কাজ শেষে ক্লান্ত দেহে শান্তির ঘুম, সন্তানদের হাসিমুখ এই সাধারণ বিষয়গুলোই তাদের কাছে অমূল্য সুখ। যেখানে ধনী মানুষ অনেক কিছু পেয়েও তৃপ্ত না, সেখানে এই মানুষগুলো অল্পেই সন্তুষ্ট থাকতে পারে।
‎নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনে সুখের সবচেয়ে বড় উৎস হলো পরিবার। পরিবারের সদস্যরা একে অপরের শক্তি, সাহস ও অনুপ্রেরণা। একজন বাবা সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করেন শুধু এই আশায় যে সন্তানরা দু’বেলা খেতে পারবে। একজন মা নিজের কষ্ট লুকিয়ে সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে চায়। ভাই-বোনের মধ্যে ভালোবাসা, দুঃখ ভাগ করে নেওয়া, একসাথে বসে সাধারণ খাবার খাওয়া—এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই তাদের কাছে জীবনের বড় সুখ হয়ে ওঠে।
‎তাছাড়া নিম্নবিত্ত মানুষের চাওয়ার পরিধি খুব বড় নয়। তারা আকাশচুম্বী স্বপ্ন দেখে না, বিলাসী জীবনের কল্পনায় বিভোর হয় না। তাদের চাওয়া খুব সাধারণ—একটু নিশ্চয়তা, একটু শান্তি, আর পরিবারের মুখে হাসি। এ কারণেই তারা ছোট সুখে বড় আনন্দ পায়। কেউ নতুন জামা কিনতে না পারলেও সন্তানের পুরোনো জামা সেলাই করে নতুন করে পরাতে পেরে আনন্দ পায়। আবার কোনো দিন সন্তানের ভালো ফলাফল দেখে ভুলে যায় নিজের সব কষ্ট।
‎নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনে সুখের আরেকটি দিক হলো সহনশীলতা। তারা কষ্ট সহ্য করতে জানে, অভাবের সাথে মানিয়ে নিতে পারে। অনেক সময় প্রতিকূলতার মাঝেও তাদের মুখে হাসি লেগে থাকে। এই হাসি তাদের চরিত্রের শক্তি প্রকাশ করে। তারা জানে জীবনের পথ সহজ নয়, তবুও জীবনের প্রতি তাদের ভালোবাসা কমে না। বরং কষ্টের মাঝেও তারা হাসতে শেখে, আনন্দ খোঁজে।
‎এই ব্যস্ত শহরে এমন সুখের চিত্র অহরহ।  যেমন একজন রিকশাচালক সারাদিন রোদে–বৃষ্টিতে মানুষের বোঝা টেনে নিয়ে বেড়ায়। শরীর ভেঙে গেলেও রাতে ঘরে ফিরে যখন সন্তান তার কাছে ছুটে আসে, তখন সে সমস্ত কষ্ট ভুলে যায়। সন্তানের সেই নিষ্পাপ হাসিই হয়ে ওঠে তার জীবনের সবচেয়ে বড় সুখ।
‎ একজন গার্মেন্টস শ্রমিক, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কারখানায় কাজ করে সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তবু মাসের শেষে যখন সে বেতন পায় এবং সেই টাকা দিয়ে পরিবারের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনে আনে, তখন তার মনে গভীর এক তৃপ্তি অনুভব হয়। পরিবারের মুখে হাসি ফুটলেই সে নিজেকে ধন্য মনে করে।
‎নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনে সুখ ক্ষণস্থায়ী হলেও গভীর। হয়তো আজ ভালো খেতে পেল, কাল পেল না; আজ কাজ আছে, কাল নেই। তবুও যখন সুযোগ আসে, তারা সেই সুখ পুরো হৃদয় দিয়ে উপভোগ করে। তারা ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা জানে, তবুও বর্তমানকে উপভোগ করতে শেখে। এটাই তাদের জীবনের বিশেষ দিক।
‎আমরা অনেক সময় সুখকে বড় বড় জিনিসের সাথে মিলিয়ে দেখি বড় বাড়ি, দামি গাড়ি, প্রচুর টাকা। কিন্তু নিম্নবিত্ত মানুষের জীবন আমাদের শেখায় সুখ আসলে মানুষের মনের অবস্থার উপর নির্ভর করে। যার মন তৃপ্ত, সেই মানুষই সুখী। টাকা সুখ কিনতে পারে, কিন্তু শান্তি কিনতে পারে না। নিম্নবিত্ত মানুষ হয়তো ধনী নয়, কিন্তু অনেক সময় তারা শান্তিতে ধনীদের থেকেও ধনী।
‎একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনে কষ্ট বেশি। কিন্তু সেই কষ্টের মাঝেই তারা জীবনের প্রকৃত অর্থ খুঁজে পায়। তারা মানুষকে মানুষ হিসেবে ভালোবাসতে জানে। সাহায্যের হাত বাড়ায়, সহানুভূতি বোঝে, অন্যের দুঃখে কাঁদতে পারে। এই মানবিক গুণাবলিই তাদের সুখকে অর্থবহ করে তোলে।
‎পরিশেষে বলা যায়, নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনে সুখের সংজ্ঞা বইয়ের পাতায় লেখা কোনো তত্ত্ব নয়, বরং জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে গড়ে ওঠা এক অনুভূতি। তাদের সুখ বড় না হলেও সত্যিকারের। তাদের আনন্দ অল্প হলেও গভীর। তারা আমাদের শেকরা জীবন মানে শুধু পাওয়ার হিসাব নয়, বরং যা আছে তা নিয়ে আনন্দ খুঁজে নেওয়ার ক্ষমতাই প্রকৃত সুখ। তাই বলা যায়, সুখের সংজ্ঞা শিখতে চাইলে আমাদের উচিত নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনকে কাছ থেকে দেখা, বোঝা এবং সম্মান করা।
লেখক: ‎তাসনিম জাহান খুশবু, 
‎শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।


Somoy Journal is new coming online based newspaper in Bangladesh. It's growing as a most reading and popular Bangladeshi and Bengali website in the world.

উপদেষ্টা সম্পাদক: প্রফেসর সৈয়দ আহসানুল আলম পারভেজ

যোগাযোগ:
এহসান টাওয়ার, লেন-১৬/১৭, পূর্বাচল রোড, উত্তর বাড্ডা, ঢাকা-১২১২, বাংলাদেশ
কর্পোরেট অফিস: ২২৯/ক, প্রগতি সরণি, কুড়িল, ঢাকা-১২২৯
ইমেইল: somoyjournal@gmail.com
নিউজরুম ই-মেইল : sjnewsdesk@gmail.com

কপিরাইট স্বত্ব ২০১৯-২০২৬ সময় জার্নাল