মো. মাইদুল ইসলাম:
৪ এপ্রিল (শনিবার) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ বটলীফ টি ফ্যাক্টরি ওনার্স এসোসিয়েশনের দ্বিবার্ষিক নির্বাচন। নির্বাচনে সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে করছেন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক মো. নিয়াজ আলী চিশতী। সময় জার্নালের সাথে সাক্ষাৎকারে তুলে ধরেন বটলীফ শিল্পের উন্নয়ন ও এসোসিয়েশন নিয়ে তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাগুলো।
এসময় তিনি জানান, এই শিল্পটাকে ইন্টারন্যাশনাল পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চিন্তা রয়েছে তার। সেজন্য এই শিল্পকে আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক উন্নত প্রযুক্তির সাথে যুক্ত করা। কারখানার মালিক সংগঠনের সদস্যদের ট্রেইন আপ করা, ক্ষুদ্র-মাঝারি কারখানাকে ঋণ পেতে সহায়তা করা, চা বোর্ডের সাথে যৌথভাবে কাজ করে তাদেরকে ইন্সটলমেন্টে বা কম মূল্যে সকল মেশিন পাওয়ার ব্যবস্থা করা। এবং বৈশ্বিক বাজারে রপ্তানির সুযোগ তৈরি করে দেয়ার পরিকল্পনার কথা জানান এই সভাপতি প্রার্থী। তার কথায় উঠে এসেছে এই শিল্পের উন্নয়নে এবং আন্তর্জাতিক মান উন্নতি করে রপ্তানিতে জোর দেয়া এবং কারখানাগুলোকে আধুনিকায়ন করে এগিয়ে নেয়া সহ ইত্যাদি বিষয়।
সময় জার্নাল: বটলীফ চা শিল্প এবং এই সংগঠনটা নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি? এবং যদি আপনি যেহেতু সভাপতি হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেছেন, জয়লাভ করলে এ সেক্টরের উন্নয়নে এবং অ্যাসোসিয়েশনের উন্নয়নে কী ভূমিকা রাখবেন যদি বলতেন?
নিয়াজ আলী চিশতী: চা শিল্প একটা ঐতিহ্যবাহী সম্ভাবনাময় খাত। চা শিল্পটা যেহেতু শতকরা একশ ভাগই আপনার দেশীয় ইনগ্রেডিয়েন্ট। অন্য কোন শিল্প সেটা আপনার গার্মেন্টস বলি অথবা আপনার ওষুধ বলি বা জুতা বলি শত শত ফ্যাক্টরি বিভিন্ন ইনগ্রিডিয়েন্ট এগুলো আমদানি করে, তারপর এখানে কিন্তু উৎপাদন করা হয়। কিন্তু চা একমাত্র শিল্প যেটা কিনা কাঁচামাল থেকে শুরু করে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রসপেক্টস। যদি জয়লাভ করে দায়িত্ব গ্রহণ করি, তাহলে এই শিল্পটাকে আপনার একটা ইন্টারন্যাশনাল পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চিন্তা আমাদের রয়েছে। সেটা হচ্ছে গিয়ে বাংলাদেশের চা কিন্তু একসময় রপ্তানি হতো। বর্তমানে কিন্তু চা রপ্তানি খুব একটা হয় না। মানে হয়তো ওয়ান টু মিলিয়ন কেজি চা রপ্তানি হয়। যেখানে আমরা হান্ড্রেড মিলিয়ন চা উৎপাদন করি। এর পেছনে কারণ? আন্তর্জাতিক মানের যে প্রযুক্তি, সে প্রযুক্তির সহায়তা না নেওয়াতে আমাদের চায়ের মানটা কিন্তু আপনার পার্শ্ববর্তী যে দেশগুলোর চেয়ে ইন্টারন্যাশনালি মান কম। প্রোপার মেডিসিন যেগুলো দরকার সেগুলো ইউজ করি না। হয়তো বিক্রি করে ফেলি, নয়তো কম করে ফেলি। আমরা যে পরিমাণ এই উর্বর শক্তি বৃদ্ধি করার জন্য রাসায়নিক সার ব্যবহার করে, সেটা কিন্তু আপনার প্রযুক্তি নির্ভর না। গতানুগতিকভাবে দিয়ে আসছে। ফলে অনেক কাজ করার সুযোগ রয়েছে।
এছাড়া চা যেহেতু আপনার বাণিজ্যমন্ত্রণলায়ের আওতাধীন একটা একটা সেক্টর, সেহেতু আপনার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সেই সাথে আপনার চা বোর্ডের সাথে সমন্বিতভাবে কাজ করে একটা জবাবদিহিমূলক সংগঠন গড়ে তুলবো।
সময় জার্নাল: বাংলাদেশ বটলীফ টি ফ্যাক্টরি ওনার্স এসোসিয়েশনের সদস্যদের জন্য কোন নতুন উদ্যোগ নিবেন কিনা?
নিয়াজ আলী চিশতী: সদস্যদের নিয়মিত ট্রেইন আপ করার ব্যবস্থা করা হবে, যাতে ভাল মানের চা উৎপাদন করতে পারে। এবং এতে আপনি যখন ভাল মানের চা উৎপাদন করবেন, তখন কিন্তু আপনি দেখতে পাবেন যে আমরা ভাল বিক্রি করতে পারব। এজন্য সদস্যদেরকে প্রতিনিয়ত ওয়ার্কশপ করা, ট্রেইনিং করানো হবে। চা একটা শিল্প। কাজেই আমরা এখানে সরকারের সাথে কৃষকের জন্য যে ব্যাংক লোন সেটাও আমরা করতে পারি। মানে আমাদের সদস্যদের জন্য সহজ ঋণ ব্যবস্থা করা। এবং লভ্যাংশে যেন আমরা করতে পারি সেখানেও কিছু কাজ করার সুযোগ আছে ইনশাল্লাহ।
আমাদের পঞ্চগড়ের বা উত্তরবঙ্গের চা এবং শ্রীমঙ্গলের চা এর মধ্যে ইমব্যালেন্স একটা সিচুয়েশন এ রয়ে গেছে। এতে আমরা দর কম পাচ্ছি। সেই বিষয়ে আমাদের চিন্তা আছে কাজ করার জন্য। যেন এটাকে কোনভাবে আপনার ডাবল স্টাইল না করার জন্য। এক কাতারে রেখে গুণগত মানের উপরে যেন দাম নির্ধারণ করা হয়। কোন অবস্থাতেই এই বটলীফ সেক্টরকে আলাদা না করা হয়। এটা নিয়ে আমাদের কাজ করার সুযোগ আছে। এতে করে আমাদের সদস্যরা লাভবান হবে।
সময় জার্নাল: আপনাদের তো এখানে তাহলে সদস্য যারা আছে তাদের তো হয়তো ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানাও আছে। তাদের জন্য কোন বিশেষ পরিকল্পনা আছে কিনা? তাদের সমস্যা বা তাদেরকে উন্নত করার জন্য।
নিয়াজ আলী চিশতী: ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানার অবশ্য চ্যালেঞ্জটা বেশি। কেননা আমরা যারা বড় তারা বেশি তৈরি করে, কস্ট মেকাপ করতে পারে। যারা ছোট তাদের যেহেতু প্রোডাকশন কম তাই তাদের কস্ট বেশি পড়ে। তাই তারা যেন আপনার সহজ শর্তে ঋণ পায় সেই বিষয়ে আমরা আমাদের অ্যাসোসিয়েশন তাদেরকে উৎসাহিত করবো, আমাদের সাথে আসেন আমরা কাজ করবো। যাতে খুব ভালোভাবে অল্প সুদে ঋণ পেতে পারে। কারণ ব্যাংকের একটা নিয়ম আছে। তেলের মাথায় তেল। ব্যাংকের চিরাচরিত অভ্যাস। তারা যখন দেখবে বড় কোম্পানি তাদেরকে কিন্তু তারা লোন দেওয়ার জন্য ম্যানেজার থেকে শুরু করে হেড অফিসের লোকজন চলে আসে। আর ছোট হলে কিন্তু আসে না।
সেই ক্ষেত্রে আমার ইচ্ছা যাতে তাদেরকে নিয়ে কাজ করার। সহজ শর্তে ঋণ পেতে পারে। এবং তাদের চাওয়া পাওয়ার জন্য আপনার কোয়ালিটি যেন কনফার্ম হয়। যেন বড় চা এর মতো কোয়ালিটি হয়। সেখানে তাদেরকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা এবং তাদেরকে উৎসাহিত করা। যেন ভালো চা তৈরি করেন।
তাদের জন্য সাপোর্ট দেওয়া। সাপোর্ট বলতে গেলে আমরা ইতিমধ্যেই কিন্তু উত্তরবঙ্গে তৈরি করেছি। প্লাকিং মেশিন দিয়ে কিন্তু এখন পাতা কাটতেছে। যেটা আগে ছিল গিয়ে হাতে এবং এখনও হাতে চলতেছে। মোর দ্যান সিক্সটি ফাইভ পার্সেন্ট হাতে কাটতেছে চা। মেশিনে সুন্দর একটা মাপে চা গুলা তোলা হয় এবং এতে মানটা অক্ষুন্ন থাকে। কিন্তু হাতে যখন পাতা কাটা হয় তখন ডাল পালা চলে আসে। তাতে মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তো এই বিষয়টা নিয়ে আমরা কাজ করবো। চা বোর্ডের সাথে যৌথভাবে একটা করে প্রোগ্রাম করে কৃষকদেরকে বা ছোট ছোট যারা ফ্যাক্টরি তাদেরকে আপনার কমমূল্যে বা ইনস্টলমেন্টে এই সকল মেশিন দেওয়া যায় কি না। দিলে তারা ধীরে ধীরে টাকা পরিশোধ করল। এভাবে কিন্তু তারা আপনার কোয়ালিটি ডেভেলপ করতে পারবে। এসব আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে।
সময় জার্নাল: আপনি একটা তো বললেন যে আন্তর্জাতিক বাজার ধরার জন্য মান বৃদ্ধি করা। আর একটা বিষয় হল যে, রপ্তানি বা আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের চা পাঠানোর জন্য ঐ আন্তর্জাতিক বা অন্যান্য দেশগুলোর সাথে আসলে যে বাজারটা ধরা বা সম্পর্ক তৈরি করা। এ বিষয়ে কোন পরিকল্পনা আছে কিনা আপনার?
নিয়াজ আলী চিশতী: যে সেক্টরে আপনার রিপ্রেজেন্টেটিভ যত দক্ষ, যে সকল সংগঠনের নেতৃবৃন্দ দক্ষ সংগঠক তারা আদায় করে নিতে পারে। আমাদের চা টা দেখেন। বলাই বাহুল্য যে আমাদের বর্তমান পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক যে কোন সময়ের থেকে ভালো। অথচ পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের আমদানি রপ্তানি ভারসাম্য কিন্তু কয়েকগুণ এর চেয়ে বেশি ভারসাম্যহীন অবস্থায় আছে। কারণ পাকিস্তান থেকে আমদানি করে কিন্তু রপ্তানি খুবই কম। অথচ আপনার এখানে কিন্তু বড় একটা সুযোগ রয়েছে। পাকিস্তান পৃথিবীর মধ্যে তৃতীয় বৃহত্তম কান্ট্রি যারা কিনা চা আমদানি করে। পাকিস্তানে কোন চা উৎপাদন হয় না। তারা আপনার কেনিয়া, শ্রীলঙ্কা এবং কানাডা এই সব জায়গা থেকে চা আমদানি করে। বাংলাদেশ থেকে চা যে আমদানি করে তার পরিমাণ খুবই নগণ্য। কিন্তু তারা প্রায় মোট ফাইভ হান্ড্রেড মিলিয়নের বেশি চা আমদানি করে। বাংলাদেশ থেকে মাত্র এক লক্ষ পয়ষট্টি হাজার ডলার চা নেয়। এখানে কিন্তু ইজিলি কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাওয়া সম্ভব। এই বিষয়ে কিন্তু কাজ করার সুযোগ আছে।
আমার মনে হয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে যদি এটা এভাবে উৎসাহিত করা হয় এবং বিভিন্ন মেসেজ করে আপনার ডাটাগুলো দেওয়া হয়। এই ভারসাম্যটা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। চা এর উপরে যে শুল্ক সেটা যদি তুলে দেয়া হয় এবং আমদানি করে তাহলে এই ভারসাম্যটা কমবে। পাশাপাশি আমরা উপকৃত হলাম এবং দুই দেশের সম্পর্কও ভালো হলো। এখানে কিন্তু অনেক কাজ করার সুযোগ আছে।
লন্ডনে প্রচুর চা বিক্রি হয়। ইংল্যান্ডে কিন্তু বড় মার্কেট। ওখানেও মার্কেট ধরার আমাদের ইচ্ছে আছে। তবে সবকিছুর মূলে আসলে চায়ের কোয়ালিটি বাড়াতে হবে। এখানে প্রান্তিক লেভেলে ট্রেনিংটা দরকার যেন কী করলে চায়ের মান বাড়ে। এগুলো নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা আছে।
বাংলাদেশে মূলত দুইটা ক্যাটাগরির চা উৎপাদন হয়। একটা হ্যারিটেজ চা যেটা শ্রীমঙ্গল, চট্টগ্রামে হয়ে থাকে। অন্যটা হলো এই বটলীফ চা যা মূলত পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও জেলায় হচ্ছে এবং এটা ফিউচারে এক্সপ্যান্ড হয়ে ময়মনসিং হওয়ার সম্ভাবনা আছে এবং কিছু কিছু কালটিভেশন করতেছে চা বোর্ড। বটলীফ চা কারখানাগুলোর নিজস্ব চা বাগান নাই। তারা বিভিন্ন প্রান্তিক চাষি যারা আছে, যেমন কারও বাড়ির আঙিনায়, কারও উঁচু জায়গা এই সকল জায়গাতে যে সকল চারা হয় তাকে বলে বটলী। তারা চারাগুলো কালেক্ট করে থকে। এবং এটা বাংলাদেশে টোটাল যে চা এর পরিমাণ নেটলি উৎপাদন হয় তার টুয়েন্টি ফাইভ পার্সেন্ট। জাতীয়ভাবে যে চা উৎপাদন হয় তার অধিকাংশই হয় বটলীফ থেকে। সর্বোপরি টোটাল মার্কেটের মধ্যে তারা আরো ভালো স্থান দখল করছে এবং তারা আশা করছে সেটা টোটাল চায়ের ত্রিশ শতাংশ উৎপাদন করবে। এবং এর যে ফ্যাক্টরিগুলো, এই ফ্যাক্টরি গুলোর অ্যাসোসিয়েশন হল বাংলাদেশ বটলীফ ফ্যাক্টরি ওনার্স এসোসিয়েশন।
এমআই