নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশের বাজারে লাগামহীন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার পাঁচটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। রোববার (২১ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি এ তথ্য জানান।
কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবুল কালামের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় গৃহীত ব্যবস্থাগুলো বিস্তারিত তুলে ধরেন। এমপি আবুল কালাম তার প্রশ্নে উল্লেখ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পূর্ব থেকেই টানা চার বছর দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে, যার ফলে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। এর প্রেক্ষিতে বর্তমান সরকার কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে তা জানতে চান তিনি।
জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, 'বিগত কয়েক বছর ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ বিদ্যমান ছিল এবং এর ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকেই এই প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। তবে সরকারের পদক্ষেপের ফলে মূল্যস্ফীতি কমতে শুরু করেছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১৪.১০ শতাংশ, যা ২০২৬ সালের মার্চ মাসে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ৮.২৪ শতাংশে নেমে এসেছে।'
সংসদে অর্থমন্ত্রী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের গৃহীত পাঁচটি প্রধান পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেন:
১. মুদ্রানীতি ও নীতি সুদহার: অতিরিক্ত অর্থের চাহিদা ও সামষ্টিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ১০.০ শতাংশে বহাল রেখেছে।
২. খাদ্য সরবরাহ ও মজুদ ব্যবস্থাপনা: খাদ্য ও নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আমদানি জোরদার করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী জানান, ১৩ এপ্রিল ২০২৬ তারিখ পর্যন্ত সরকারি পর্যায়ে ৪ লক্ষ মেট্রিক টন চাল ও ৬.০৮ লক্ষ মেট্রিক টন গম আমদানি করা হয়েছে। একই সময়ে বেসরকারি খাতে চাল ও গমের আমদানির পরিমাণ যথাক্রমে ৭.৩৪ লক্ষ ও ৬১.৬০ লক্ষ মেট্রিক টন। সরকারি গুদামে বর্তমানে ১৮.৬৩ লক্ষ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য মজুদ রয়েছে।
৩. সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি: নিম্ন ও মধ্যবিত্তের চাপ কমাতে ফ্যামিলি কার্ড ও বিভিন্ন লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাড়ানো হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৯৫টি কর্মসূচির আওতায় ১ লক্ষ ১৬ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
৪. কৃষি সহায়তা ও কৃষক কার্ড: উৎপাদন বাড়াতে সেচসহ কৃষক-সহায়তা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। ১লা বৈশাখ থেকে প্রি-পাইলটিং আকারে নতুন 'কৃষক কার্ড' ব্যবস্থার উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী, যা পর্যায়ক্রমে দেশজুড়ে সম্প্রসারণ করা হবে।
৫. বহিঃখাত ও রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা: বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে বাজারভিত্তিক বিনিময় হার বজায় রাখা হয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ শেষে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪.১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে।
অর্থমন্ত্রী আরও জানান, সরকারের এসব সমন্বিত উদ্যোগের ফলে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর ৯.১৩ শতাংশ থেকে কমে মার্চ ২০২৬-এ ৮.৭১ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির অস্থিরতার কারণে নতুন চাপ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সর্বাত্মক কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে বলে তিনি সংসদকে আশ্বস্ত করেন।
এমআই