নিজস্ব প্রতিবেদক:
শেখ হাসিনা এবং তার সরকারের মন্ত্রী ও সুবিধাভোগীদের পাচারের অর্থ ফেরাতে বাংলাদেশ সরকার ১১টি মামলা পরিচালনা করছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেন, 'শেখ হাসিনা এবং তার সরকারের মন্ত্রী ও অন্যান্য সুবিধাভোগী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পাচার করা অর্থ পুনরুদ্ধারে সরকার অগ্রাধিকার দিয়ে আইনি প্রক্রিয়া পরিচালনা করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সভাপতিত্বে একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এই টাস্কফোর্সের চিহ্নিত ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১টি মামলায় পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারের জন্য আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।'
আজ বুধবার (২২ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী এসব তথ্য জানান।
মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. কামরুজ্জামান লিখিত প্রশ্নে জানতে চান- বিগত আওয়ামী ফ্যাসিস্ট আমলে বিভিন্ন উপায়ে বা প্রক্রিয়া অবলম্বন করিয়া ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পাচার করা হইয়াছে। উক্ত টাকা দেশে ফিরাইয়া আনিবার ব্যাপারে সরকারের পক্ষ হইতে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হইয়াছে কিনা বা হইবে কি না?
জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, 'অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্যমতে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অর্থ প্রবাহের পরিমাণ আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বছরে গড়ে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ১.৮ লাখ কোটি টাকা)। পাচার করা এ অর্থ একাধিক দেশে স্থানান্তরিত হওয়ার অভিযোগ থাকায় তা উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময়, সম্পদ শনাক্তকরণ এবং পারস্পরিক আইনগত সহায়তা জোরদার করা হচ্ছে।'
তিনি বলেন, 'এ লক্ষ্যে পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তি (এমএলএটি) সম্পাদন এবং আইনগত সহায়তা অনুরোধ (এমএলএআর) বিনিময় প্রক্রিয়ার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছে।'
তিনি আরও বলেন, 'অর্থ পাচারের গন্তব্য দেশগুলোর মধ্যে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত ১০টি দেশের [কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ড, থাইল্যান্ড ও হংকং] মধ্যে ৩টি দেশ [মালয়েশিয়া, হংকং ও সংযুক্ত আরব আমিরাত] চুক্তি সইয়ের বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে। বাকি ৭টি দেশের সঙ্গে চুক্তি সইয়ের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।'
তারেক রহমান বলেন, 'আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্সের চিহ্নিত অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কেইসগুলোর অনুসন্ধান ও তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নেতৃত্বে এবং বাংলাদেশ পুলিশের সিআইডি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সমন্বয়ে ১১টি যৌথ অনুসন্ধান ও তদন্ত দল [জয়েন্ট ইনভেস্টিগেশন টিম-জেআইটি] গঠন করা হয়েছে।'
তিনি বলেন, 'জেআইটি গঠনের পর অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলাগুলোর অগ্রগতি নিম্নরূপ: গত ২৫ মার্চ পর্যন্ত আদালত দেশে মোট ৫৭ হাজার ১৬৮ কোটি ৯ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোক (অ্যাটাচমেন্ট) ও অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) করা হয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, 'অপরদিকে আদালতের নির্দেশে বিদেশে মোট ১৩ হাজার ২৭৮ কোটি ১৩ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে। সবমিলিয়ে দেশে-বিদেশে সর্বমোট প্রায় ৭০ হাজার ৪৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ আদালত ক্রোক ও অবরুদ্ধ করেছে।'
তারেক রহমান বলেন, 'পাচার করা অর্থ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ১৪১টি মামলা করা হয়েছে। যার মধ্যে ১৫টি মামলার চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে এবং ৬টি মামলার রায় হয়েছে। সার্বিকভাবে বর্তমান সরকার দুর্নীতি, মানিলন্ডারিং এবং আর্থিক অপরাধ দমনে বৃহত্তর কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিদেশে পাচার করা সম্পদ পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে।'
তিনি বলেন, 'বিদেশে পাচার করা সম্পদ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করার লক্ষ্যে চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ফিনান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিটের অধীনে স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি ডিভিশন গঠন করা হয়েছে।'
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'গত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী আমলে সংঘটিত অর্থপাচার ও দুর্নীতির অনুসন্ধান করে একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং এতে চিহ্নিত দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।'
এমআই