মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬

আমাদের সামর্থ্য সীমাহীন না হলেও নতুন কিছু করা সম্ভব: প্রধানমন্ত্রী

মঙ্গলবার, মে ১২, ২০২৬
আমাদের সামর্থ্য সীমাহীন না হলেও নতুন কিছু করা সম্ভব: প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক:

উচ্চশিক্ষাকে সময়োপযোগী, প্রযুক্তিনির্ভর ও দক্ষতাভিত্তিক করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, শুধু পুঁথিগত শিক্ষাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা এবং উদ্ভাবনের দিকে মনোযোগ না দিলে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে আমাদের টিকে থাকা কষ্টকর হয়ে পড়বে। আমাদের সামর্থ্য সীমাহীন না হলেও সীমিত সম্পদের কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে অবশ্যই আমাদের পক্ষেও নতুন কিছু করা সম্ভব।

মঙ্গলবার (১২ মে) সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবন অডিটোরিয়ামে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ‘বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা রূপান্তর: টেকসই উৎকর্ষতার রোডম্যাপ’ শীর্ষক কর্মশালার আয়োজন করে। এতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব আলোচনায় শিক্ষা ও গবেষণায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বৈশ্বিক মান বজায় রাখতে পারছে কি না- এমন একটি প্রশ্ন অনেকের আলোচনায় ফুটে উঠেছে। দুঃখজনক হলেও বাস্তবতা হচ্ছে, একবিংশ শতাব্দীতে শিক্ষা, গবেষণা ও জ্ঞানের উৎকর্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাঙ্কিংয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান এখনো প্রত্যাশিত উচ্চতায় পৌঁছুতে পারেনি। মুখস্তবিদ্যা এবং সার্টিফিকেটনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

তিনি বলেন, র‍্যাঙ্কিংয়ের ক্ষেত্রে সাধারণত গবেষণা প্রকাশনা, সাইটেশন এবং উদ্ভাবন এই বিষয়গুলোকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান কোথায়- এ বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের শিক্ষাবিদরা নিশ্চয়ই আরও চিন্তাভাবনা করবেন।

গবেষণা ও উদ্ভাবনের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু পুঁথিগত শিক্ষাই নয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা এবং উদ্ভাবনের দিকে মনোযোগ না দিলে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে আমাদের টিকে থাকা কষ্টকর হয়ে পড়বে।

সাবেক শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করার আহ্বান
বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও উদ্ভাবন কার্যক্রমে সাবেক শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভাবন কিংবা গবেষণা কার্যক্রম এগিয়ে নিতে সরকার অর্থ বরাদ্দ দেবে এটাই স্বাভাবিক। তবে আমি জানি, ব্রিটেনসহ বিশ্বের অনেক দেশেই যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই তাদের অনেকেই কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা এবং উদ্ভাবন কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকেন। শিক্ষার্থীরা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ, আর অ্যালামনাইরা হলো তার মেরুদণ্ড।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের দেশে-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত অ্যালামনাইদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সেসব অ্যালামনাইদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা ও গবেষণা উন্নয়নে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়ার জন্য আমি উপস্থিত শিক্ষাবিদদের প্রতি বিনীত আহ্বান জানাই।

উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যেই বেকারত্ব বেশি
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রতিবছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী বের হন। উচ্চশিক্ষা নিয়েও অনেককে বেকার থাকতে হয়। অর্থাৎ, বেকারত্বের হার উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেশি।

তিনি বলেন, এর কারণ সম্পর্কে নানা মত রয়েছে। তবে এ ব্যাপারে অনেকেই একমত যে, একাডেমিক শিক্ষা অর্জনের পাশাপাশি দক্ষতা অর্জন করতে না পারাই শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেশির অন্যতম কারণ।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার মনে করে, প্রাথমিক সিলেবাস থেকে শুরু করে উচ্চতর পর্যায় পর্যন্ত আমাদের শিক্ষা কারিকুলাম ঢেলে সাজানো এখন সময়ের দাবি।

তিনি আরও বলেন, নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন কর্মমুখী শিক্ষা ছাড়া বেকারত্ব নিরসন সম্ভব নয়। সময়োপযোগী শিক্ষা কারিকুলাম ছাড়া বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকাও সম্ভব নয়।

অ্যাপ্রেন্টিসশিপ, ইন্টার্নশিপ ও শিল্পখাতের সঙ্গে সংযোগ
উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে সময়োপযোগী করতে সরকার অ্যাপ্রেন্টিসশিপ, ইন্টার্নশিপ এবং ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে বিভাগীয় শহরগুলোতে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে স্থানীয় শিক্ষা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক স্থাপন করে এই কার্যক্রম শুরু করা হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা পুঁথিগত বিদ্যা অর্জনের পাশাপাশি হাতে কলমে শিক্ষা লাভ করে শিক্ষার্থী অবস্থাতেই কর্মদক্ষতা অর্জন করতে সক্ষম হবেন।

তিনি বলেন, ফলে শিক্ষাজীবন শেষে তাকে আর বেকার থাকতে হবে না।

সিড ফান্ডিং ও উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনোভেটিভ বিজনেস আইডিয়া বাণিজ্যিকীকরণ করতে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় সিড ফান্ডিং বা ইনোভেশন গ্রান্ট প্রদান করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, ক্যাম্পাস থেকে ব্যবসায়িক উদ্যোক্তা তৈরি করা। এই উদ্যোক্তারা নতুন এবং সৃজনশীল ব্যবসায়িক ধারণা বাস্তবায়ন করে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারবেন।

তার ভাষায়, শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় কর্মদক্ষতা অর্জনের ফলে এমনও হতে পারে- একজন শিক্ষার্থী চাকরির জন্য অপেক্ষা না করে নিজেই একজন উদ্যোক্তা হিসেবে আরও কয়েকজনের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন।

‘সায়েন্স পার্ক’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা
সরকার উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন ইনস্টিটিউট’ এবং ‘সায়েন্স পার্ক’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সাথে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিজ্ঞান মেলা, ইনোভেশন ফেয়ার, প্রোডাক্ট সোর্সিং ফেয়ারসহ এ ধরনের শিক্ষা ও দক্ষতা বিষয়ক আয়োজনকে উৎসাহিত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। শুধু উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেই নয়, স্কুল পর্যায় থেকেই কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে পা দিয়েছে। এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স ও অটোমেশন, ইন্টারনেট অব থিংস, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, বায়োটেকনোলজি, সাইবার সিকিউরিটি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইন্টারনেট অব থিংস, বিগ ডাটা, ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স, ন্যানো টেকনোলজি, পঞ্চম প্রজন্মের ওয়্যারলেস প্রযুক্তি- এসব উন্নততর প্রযুক্তি একদিকে আমাদের চিন্তার জগৎ নিয়ন্ত্রণ করছে। অন্যদিকে, শাসন করছে মানুষের কর্মক্ষেত্র বা কর্মসংস্থান।

তিনি বলেন, নিত্যনতুন প্রযুক্তির ব্যবহার একদিকে প্রথাগত চাকরির বাজারে বেকারত্ব বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে তৈরি করছে নিত্য নতুন কর্মসংস্থান।

এ বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের মুখস্তবিদ্যা এবং সার্টিফিকেটে নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চাহিদা অনুযায়ী আমাদের প্রচলিত ধারার শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষা শুধু ব্যক্তির পরিবর্তনের জন্যই নয়, বরং বর্তমানে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উদ্ভাবন এবং বিশ্বমানের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা তৈরিরও প্রধান নিয়ামক। উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে অর্থাৎ, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের মধ্যে আরও শক্তিশালী সংযোগ গড়ে তুলতে হবে। কারিকুলাম প্রণয়নে শিল্পখাতের চাহিদাকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে জ্ঞানের চর্চা কেবল একটি নির্দিষ্ট বিষয়েই আবদ্ধ নয়। বরং, আমরা দেখি, ডাটা সায়েন্সের সঙ্গে বায়োলজি, বা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সঙ্গে হয়তো সমাজবিজ্ঞানের মেলবন্ধন ঘটছে।

ব্রিটিশ লেখক টম উইনের একটি মন্তব্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বে বহুল ব্যবহৃত ট্যাক্সি কোম্পানি উবারের নিজের কোনো ট্যাক্সি নেই। বিশ্বে অপ্রতিদ্বন্দ্বী সোশ্যাল মিডিয়া ফেসবুক নিজে কনটেন্ট তৈরি করে না। বিশ্বের বৃহত্তম অনলাইনে বিজনেস প্লাটফর্ম আলিবাবার কোনো মজুত পণ্য নেই।

তিনি আরও বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে বড় আবাসন প্রোভাইডার এয়ার বিএনবির নিজেদের কোনো রিয়েল এস্টেট নেই। অর্থাৎ, ইনোভেটিভ আইডিয়া দিয়ে তারা যার যার ক্ষেত্রে বিশ্ব শাসন করছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত এক একটি স্মার্ট ইন্টারফেস। তারা সেবা দিচ্ছে না, বরং যারা সেবা দিতে চায় এবং যারা সেবা নিতে চায়, তাদের এক জায়গায় নিয়ে আসছে। এটিই প্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞান।

জ্ঞান ও মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র গড়তে চায় সরকার
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের সামর্থ্য সীমাহীন না হলেও সীমিত সম্পদের কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে অবশ্যই আমাদের পক্ষেও নতুন কিছু করা সম্ভব।

তিনি বলেন, আমাদেরও প্রচুর মেধাবী মানুষ রয়েছেন যারা সুযোগ বা সুবিধা পেলে তাদের পক্ষেও বিশ্বমানের কিছু করা অসম্ভব নয়।

তার ভাষায়, মেধা পাচার রোধ করে মেধার বিকাশ ও মেধার লালন করে আমরা ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে চাই। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার একটি জ্ঞান ও মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র এবং সমাজ গড়তে চায়। জ্ঞান ও মেধাভিত্তিক সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি হলো এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা যেখানে শিক্ষা, গবেষণা, মেধা, যোগ্যতা এবং সৃজনশীলতা সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে।

এমআই 


Somoy Journal is new coming online based newspaper in Bangladesh. It's growing as a most reading and popular Bangladeshi and Bengali website in the world.

উপদেষ্টা সম্পাদক: প্রফেসর সৈয়দ আহসানুল আলম পারভেজ

যোগাযোগ:
এহসান টাওয়ার, লেন-১৬/১৭, পূর্বাচল রোড, উত্তর বাড্ডা, ঢাকা-১২১২, বাংলাদেশ
কর্পোরেট অফিস: ২২৯/ক, প্রগতি সরণি, কুড়িল, ঢাকা-১২২৯
ইমেইল: somoyjournal@gmail.com
নিউজরুম ই-মেইল : sjnewsdesk@gmail.com

কপিরাইট স্বত্ব ২০১৯-২০২৬ সময় জার্নাল