মো. শাদনম শাহরিয়ার রূপম:
যে নির্মোহ স্রোত শত শত স্বপ্ন, লক্ষ্য, শ্রম, আশা-আকাঙ্ক্ষাকে কখনও সাফল্যের তীরে পৌঁছে দেয়, আবার কখনও অবহেলায় অতল গহ্বরে ভাসিয়ে নিয়ে যায়—সেই স্রোতের নাম সময়। প্রচলিত প্রবাদে বলা হয়, “সময় ও স্রোত কারও জন্য অপেক্ষা করে না।” জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সময় আমাদের সঙ্গী হয়ে থাকে। তাই এই অনিবার্য বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে জীবনকে পরিকল্পিতভাবে সাজাতে হয়। বিশেষত শিক্ষাজীবনে শৃঙ্খলাবোধ গড়ে তোলা, ব্যক্তিগত ও একাডেমিক জীবনে ভারসাম্য রক্ষা, লক্ষ্য অর্জনের পথে প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করার জন্য সময়ের যথাযথ ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব অপরিসীম।
সময় সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকলেই একজন ব্যক্তি প্রকৃত অর্থে শৃঙ্খলাবদ্ধ হতে পারে। শিক্ষাজীবনে ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, হোমওয়ার্ক, প্রেজেন্টেশন, পরীক্ষা, ভাইভা—এসব একাডেমিক কার্যক্রমের পাশাপাশি পারিবারিক দায়িত্ব, সামাজিক কাজ এবং ব্যক্তিগত উন্নয়নের নানা বিষয় সামলাতে হয়।
কোন কাজ কখন করতে হবে, কত সময় লাগবে এবং কোন কাজটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ—এই বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকলে শিক্ষার্থী তার প্রতিটি কাজ সুচারুভাবে সম্পন্ন করতে পারে। অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কাজ সম্পাদন করলে দৈনন্দিন জীবন ও শিক্ষাজীবনের মধ্যে একটি সুন্দর ভারসাম্য তৈরি হয়। যেহেতু সময় সীমিত, তাই ভবিষ্যতে অর্জিত জ্ঞানকে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হলে বর্তমান সময়কে যথাযথভাবে ব্যবহার করতেই হবে।
বর্তমান বিশ্বের সফল ব্যক্তিদের জীবন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাদের সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি ছিল সময়ের কার্যকর ব্যবস্থাপনা। Elon Musk “টাইম ব্লকিং” (Time Blocking) কৌশল ব্যবহারের জন্য পরিচিত। তিনি তার পুরো দিনকে ছোট ছোট সময়খণ্ডে ভাগ করে নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করেন। এই সুপরিকল্পিত পদ্ধতি তাকে একসঙ্গে একাধিক বৃহৎ প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় সহায়তা করে। Bill Gates-ও অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সময় ব্যবহার করেন। তিনি নিয়মিত পড়াশোনার জন্য সময় রাখেন এবং বছরে দুবার “থিংক উইক” (Think Week) পালন করেন, যেখানে নতুন ধারণা নিয়ে চিন্তা ও অধ্যয়ন করেন। বাংলাদেশের Fahim Mashroor-ও তার পেশাগত সাফল্যের পেছনে সময় ব্যবস্থাপনাকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এসব উদাহরণ আমাদের শেখায় যে প্রতিভা ও পরিশ্রমের পাশাপাশি সময়কে সঠিকভাবে কাজে লাগানোই সফলতার মূল চাবিকাঠি।
বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীদের সামনে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত আসক্তি, অনলাইন গেম, উদ্দেশ্যহীন ইন্টারনেট ব্যবহার, মাদক এবং অন্যান্য নেতিবাচক অভ্যাস শিক্ষার্থীদের অগ্রযাত্রায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
যদি শিক্ষার্থীরা সময়কে নির্দিষ্ট ভাগে ভাগ করে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করে, তবে এসব বাধা সহজেই অতিক্রম করা সম্ভব। কারণ খারাপ অভ্যাসের পেছনে যে সময় ব্যয় হয়, সেই সময়কে পড়াশোনা, সৃজনশীল কাজ, খেলাধুলা এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমে ব্যয় করলে ধীরে ধীরে ভালো কাজের প্রতিই আগ্রহ তৈরি হয়। ফলে সময়ের সদ্ব্যবহার একজন শিক্ষার্থীকে শুধু সফলই করে না, বরং তাকে সঠিক জীবনবোধও শেখায়।
শিক্ষাজীবনে মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক শিক্ষার্থী সময়মতো পড়াশোনা সম্পন্ন না করে কাজ জমিয়ে রাখে। এর ফলে পরীক্ষার আগে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা, অনিদ্রা ও মানসিক ক্লান্তি দেখা দেয়। একই সঙ্গে শারীরিকভাবেও দুর্বলতা অনুভূত হয়।
পরিকল্পিতভাবে প্রতিদিন অল্প অল্প করে পড়াশোনা করলে চাপ অনেকটাই কমে যায়। পর্যাপ্ত ঘুম, বিশ্রাম, ব্যায়াম এবং বিনোদনের জন্যও সময় বের করা সম্ভব হয়। ফলে শিক্ষার্থী সুস্থ মন ও শরীর নিয়ে পড়াশোনা করতে পারে এবং কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জনের সম্ভাবনা বাড়ে।
ধারালো ছুরি দিয়ে যেমন প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করা যায়, তেমনি অসাবধানতায় সেটি ক্ষতির কারণও হতে পারে। সময়ও ঠিক তেমন। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি জীবনে সাফল্যের দ্বার উন্মোচন করে; আর অবহেলায় অপচয় করলে ব্যর্থতা অনিবার্য হয়ে ওঠে।
শিক্ষাজীবন মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি। এই সময়ের যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী শুধু ভালো ফলাফলই অর্জন করে না, বরং গড়ে তোলে শৃঙ্খলাবদ্ধ, আত্মবিশ্বাসী ও সফল ভবিষ্যৎ।
সময়কে সম্মান করতে শেখা মানে নিজের স্বপ্নকে সম্মান করা। আর যে শিক্ষার্থী সময়ের মূল্য বোঝে, সাফল্য তার কাছেই ধরা দেয়।
লেখক: শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়