রবিবার, ১৭ মে ২০২৬

পদত্যাগ করছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার

রোববার, মে ১৭, ২০২৬
পদত্যাগ করছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ঘনিষ্ঠ মহলে জানিয়েছেন, তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়াতে চান। তবে তড়িঘড়ি নয়, সুনির্দিষ্ট সময়সূচি মেনেই তিনি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেবেন।

ডেইলি মেইলের প্রতিবেদক ড্যান হজেস দাবি করেন, গতকাল শেষ বিকেলে মন্ত্রিসভার এক সদস্যের তাকে বলেন, 'কিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতা বোঝেন। তিনি বুঝতে পারছেন, এই চলমান বিশৃঙ্খলা আর বেশি দিন চলতে দেওয়া যায় না। তিনি স্রেফ মর্যাদার সঙ্গে নিজের ইচ্ছেমতো সময়ে পদত্যাগ করতে চান। এজন্য একটি সময়সূচিও ঘোষণা করবেন তিনি।'

মন্ত্রিসভার আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, এই ঘোষণা ঠিক কবে আসবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। স্টারমারের কিছু প্রবীণ সহযোগী তাকে এখনই কোনো মন্তব্য না করার পরামর্শ দিচ্ছেন। তাদের মতে, মেকারফিল্ড উপনির্বাচনের প্রাথমিক ভোট সমীক্ষা ও প্রচারের গতিপ্রকৃতি সামনে না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত।

এক মন্ত্রীর দাবি, 'প্রধানমন্ত্রীর সাবেক চিফ অভ স্টাফ মরগ্যান ম্যাকসুইনি তাকে আরও কিছু দিন টিকে থাকার অনুরোধ করছেন। ম্যাকসুইনির যুক্তি, লড়াই যদি হাড্ডাহাড্ডি হয় কিংবা অ্যান্ডির হারার সম্ভাবনা তৈরি হয়, তবে পরিস্থিতি বদলাতেও পারে।'

তবে মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রীর এক সমর্থক ডেইলি মেইলের প্রতিবেদককে বলেন, 'উপনির্বাচনের ফল প্রকাশ পর্যন্ত অপেক্ষা করার ঝুঁকি স্টারমার নেবেন না। কারণ, সেটি তার ব্যক্তিগত সম্মানে আঘাত করতে পারে। তিনি যদি অপেক্ষা করেন এবং তারপর অ্যান্ডি বার্নহ্যাম জিতে যান, তবে মনে হবে যে বার্নহ্যামের চাপেই তিনি পদ ছাড়তে বাধ্য হলেন।'

নিজ দলের ভেতরেই বিদ্রোহে খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে আছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির আইনপ্রণেতাদের মধ্যে এখন বাঁধভাঙা অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। একের পর এক আইনপ্রণেতা প্রকাশ্যে প্রধানমন্ত্রীর ওপর থেকে আস্থা হারানোর কথা বলছেন। 

পরিহাসের বিষয় হল, স্টারমারের আগাম পদত্যাগের ঘোষণা ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহামের ওয়েস্টমিনস্টারে ফেরার লড়াইয়ে পানি ঢেলে দিতে পারে। এক প্রবীণ সহযোগী বলেন, লেবার দলের প্রার্থী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের শিবির চাইছে ১৮ জুন মেকারফিল্ডের ভোটের আগে স্টারমার যেন কোনো ঘোষণা না করেন। 'ব্যালটে কিয়ার স্টারমারের নাম থাকলে লড়াইটা অনেক সহজ হবে। অ্যান্ডি ভোটারদের বলতে চান, "আমাকে ভোট দিলে আমি ওয়েস্টমিনস্টারে গিয়ে ডাউনিং স্ট্রিট থেকে তাকে টেনে বের করব।"'

বার্নহ্যাম শিবিরের এক মুখপাত্র অবশ্য বলেছেন, স্টারমার পদত্যাগের সময়সূচি ঘোষণা করবেন কি না, সেটি নিয়ে তারা 'উদ্বিগ্ন নন'।

তবে বার্নহ্যামের আরেক মিত্র ডেইলি মেইলের প্রতিবেদককে বলেন, 'আমরা প্রচারের বার্তায় কোনো জটিলতা চাই না। বিষয়টা সহজ রাখাই ভালো। আমরা যাতে সরাসরি বলতে পারি, "আপনারা যদি পরিবর্তনের ঢিমেতালে বিরক্ত হয়ে থাকেন, তবে অ্যান্ডিকে ভোট দিন এবং ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিটে অবিলম্বে বদল দেখুন।"'

গত এক সপ্তাহ ধরে স্টারমার ও তার প্রধান উপদেষ্টাদের মানসিক পরিস্থিতি অত্যন্ত দোদুল্যমান ছিল। সোমবার সন্ধ্যায় একের পর এক জুনিয়র মন্ত্রীর পদত্যাগের হিড়িকে সরকার যখন টালমাটাল, তখনই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বুঝতে শুরু করেন যে অনিবার্য পরিণতির কাছে মাথা নত করা ছাড়া তার আর কোনো পথ নেই।

পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করতে এবং প্রবীণ মন্ত্রীদের মনোভাব বুঝতে স্টারমার তাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধেই ক্রমাগত আক্রমণাত্মক প্রচারণা শুরু হয়, বিশেষত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের ঘনিষ্ঠ শিবিরের পক্ষ থেকে। এতে চটে যান স্টারমার ও তার মিত্ররা। 

একটি সূত্রের দাবি, স্টারমারের বক্তব্য ছিল, 'আমি ভদ্রভাবে সবকিছু মেটাতে চাইছি, আর ওরা আমার পিঠে ছুরি মারছে।' পরদিন সকালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর চিফ সেক্রেটারি ড্যারেন জোন্সকে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হতে পাঠানো হয়, যাতে পদত্যাগের সম্ভাব্য ঘোষণার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা যায়। 

কিন্তু পরের সাক্ষাৎকার দেওয়ার আগেই পরিস্থিতি বদলে যায়। ব্রিটিশ সরকারের এক উপদেষ্টা ডেইলি মেইলের এই প্রতিবেদককে বলেন, '১০ নং ডাউনিং স্ট্রিট থেকে ড্যারেনের কাছে একটা ফোন আসে। বলা হয়, "সুর বদলাও। আমরা মাটি কামড়ে পড়ে আছি।"'

পরের ৪৮ ঘণ্টা মন্ত্রিসভার শীর্ষ সদস্যদের এই বিশ্বাসঘাতকতার জেরে স্টারমারের জেদ আরও চেপে বসে। এই তালিকায় সবার উপরে ছিলেন শাবানা মাহমুদ। তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী জশ সাইমন্স 'দ্য টাইমস' পত্রিকায় একটি নিবন্ধ লিখে লেবার পার্টির বিক্ষুব্ধ এমপিদের উসকে দেন। সাইমন্স লেখেন, 'আমার মনে হয় না প্রধানমন্ত্রী এই পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবেন। দেশের মানুষ তার ওপর আস্থা হারিয়েছে। নতুন প্রধানমন্ত্রীর হাতে সুশৃঙ্খলভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যবস্থা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা উচিত তার।'

এই ঘটনায় স্টারমার গভীর আঘাত পান। কারণ সাইমন্স ছিলেন তার অন্যতম প্রধান কৌশলবিদ এবং স্টারমারপন্থি থিঙ্কট্যাঙ্ক লেবার টুগেদার-এর ডিরেক্টর।

এদিকে ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিটের প্রায় সবাই-ই কার্যত বিপক্ষে চলে গেছে। স্টারমারের এক সমর্থক এই প্রতিবেদককে জানান, বাইরে যে দুই প্রবীণ মন্ত্রী ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে প্রকাশ্য সমর্থন জোগাচ্ছেন, তারাই তলে তলে নিজেদের বিশেষ উপদেষ্টাদের পাঠাচ্ছেন এমপিদের কাছে, যাতে তারা স্টারমারের পদত্যাগের দাবি তোলেন। অন্যদিকে নতুন নেতার অধীনে মন্ত্রিসভায় নিজেদের পদ পাকা করতে অন্য কয়েকজন প্রবীণ মন্ত্রী ইতিমধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরের সঙ্গে গোপন দর কষাকষি শুরু করেছেন।

এক মন্ত্রী বলেন, 'কিয়ারকে যেটা সবচেয়ে বেশি আঘাত করেছে তা হলো—মানুষ তার সামনে এসে বলছিল, "আমি এখনও আপনার সঙ্গেই আছি।" তার পর ঘর থেকে বেরোতেই চক্রান্তকারীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে পুরোদমে ঘুঁটি সাজাতে বসে যাচ্ছিল।'

চূড়ান্ত মুহূর্তটি আসে বৃহস্পতিবার। ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিটের আশা ছিল, যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি ও এনএইচএস-এর চিকিৎসার অপেক্ষমান তালিকা-সংক্রান্ত একগুচ্ছ ইতিবাচক খবরকে হাতিয়ার করে পরিস্থিতি আবার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে। এর মাধ্যমে সরকারের ধীর কিন্তু স্থির কাজের খতিয়ান তুলে ধরে নতুন করে প্রচার শুরু করার পরিকল্পনা ছিল তাদের।

কিন্তু ঠিক তখনই চ্যান্সেলর র‍্যাচেল রিভস ডাউনিং স্ট্রিটে গিয়ে বিবিসিকে একটি সাক্ষাৎকার দেন। সেখানে তিনি বলেন, 'চ্যান্সেলর হিসেবে স্বাস্থ্যসেবায় আমি বছরে অতিরিক্ত ২৯ বিলিয়ন পাউন্ড বরাদ্দ করতে পেরেছি। এর ফলে চিকিৎসার অপেক্ষমান তালিকা নিশ্চিতভাবেই আরও ছোট হয়ে আসবে।'

'প্রধানমন্ত্রী এবং আমি' না বলে কেবল 'আমি' শব্দটির ব্যবহারকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। মন্ত্রিসভার এক সদস্য ডেইলি মেইলের প্রতিবেদককে বলেন, 'রিভস আসলে নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর থেকে আলাদা করে নিচ্ছেন।'

এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মন্ত্রিসভা থেকে ইস্তফা দেন ওয়েস স্ট্রিটিং। সেই ধাক্কা সামলানোর আগেই খবর আসে, অ্যান্ডি বার্নহ্যামের পার্লামেন্টে ফেরার পথ প্রশস্ত করতে মেকারফিল্ডের আসন ছেড়ে দিচ্ছেন জশ সাইমন্স।

মন্ত্রিসভার এক সদস্য বলেন, '১০ নং ডাউনিং স্ট্রিটের কাছে এটা ছিল চরম আঘাত। ওরা ভেবেছিল ওয়েসকে বাগে আনা গেছে আর অ্যান্ডি আসন পাওয়ার বিষয়ে স্রেফ ফাঁকা আওয়াজ দিচ্ছেন।'

বার্নহ্যাম যাতে নির্বাচনে দাঁড়াতে না পারেন, সেজন্য লেবার পার্টির শীর্ষ নিয়ামক সংস্থা ন্যাশনাল এক্সিকিউটিভ কমিটির সদস্যদের রাজি করাতে শেষ মুহূর্তে ডাউনিং স্ট্রিটের অন্দরমহলে মরিয়া তৎপরতা শুরু হয়। কিন্তু লেবার পার্টির ডেপুটি লিডার লুসি পাওয়েলের এক অভূতপূর্ব পদক্ষেপে সেই চেষ্টাও ভেস্তে যায়। মাত্র তিন ঘণ্টার এক ঝোড়ো আলোচনার মাধ্যমে স্টারমারের টিমকে পুরোপুরি অন্ধকারে রেখে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন তিনি। এনইসির এক সদস্য জানান, '১০ নং ডাউনিং স্ট্রিট কিছু বুঝে ওঠার আগেই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল।'

গত সপ্তাহে স্টারমারের এক বন্ধুর কাছে ডেইলি মেইলের এই প্রতিবেদক জানতে চেয়েছিলেন, পরিস্থিতি এতটা আশঙ্কাজনক হওয়া সত্ত্বেও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কি লড়াই চালিয়ে যাবেন? জবাবে তিনি বলেছিলেন, 'কিয়ার ভীষণ একগুঁয়ে। ও বিশ্বাস করে, কোনো কিছুই শেষ কথা নয়। ওর কই মাছের প্রাণ—বড় শক্ত।'

কিন্তু পরিস্থিতি এখন আর তেমন নেই। কিয়ার স্টারমারও সম্ভবত বুঝে গেছেন, তার কই মাছের প্রাণও আর তাকে ক্ষমতায় রাখতে পারবে না।

এমআই 


Somoy Journal is new coming online based newspaper in Bangladesh. It's growing as a most reading and popular Bangladeshi and Bengali website in the world.

উপদেষ্টা সম্পাদক: প্রফেসর সৈয়দ আহসানুল আলম পারভেজ

যোগাযোগ:
এহসান টাওয়ার, লেন-১৬/১৭, পূর্বাচল রোড, উত্তর বাড্ডা, ঢাকা-১২১২, বাংলাদেশ
কর্পোরেট অফিস: ২২৯/ক, প্রগতি সরণি, কুড়িল, ঢাকা-১২২৯
ইমেইল: somoyjournal@gmail.com
নিউজরুম ই-মেইল : sjnewsdesk@gmail.com

কপিরাইট স্বত্ব ২০১৯-২০২৬ সময় জার্নাল