আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
প্রশান্ত মহাসাগরে দ্রুত শক্তিশালী হয়ে উঠছে এল নিনো। আবহাওয়া পূর্বাভাস সংস্থাগুলোর নতুন বিশ্লেষণ বলছে, এটি ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী ‘সুপার এল নিনো’তে রূপ নিতে পারে। এতে আগামী বছর বিশ্বজুড়ে রেকর্ড তাপমাত্রা, খরা, বন্যা, খাদ্যসংকট ও বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলছেন, ২০২৭ সাল বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ বছর হতে পারে।
প্রশান্ত মহাসাগরের কিছু অংশে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক দ্রুত বাড়ছে। চলতি সপ্তাহের তথ্য অনুযায়ী, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ০ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। এটি এল নিনো শুরুর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়।
এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের স্বাভাবিকের তুলনায় উষ্ণ হয়ে ওঠার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত প্রক্রিয়া। আগামী কয়েক মাসে এটি আরও শক্তিশালী হয়ে শরৎ নাগাদ ‘খুব শক্তিশালী’ বা তথাকথিত ‘সুপার এল নিনো’তে পরিণত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে প্রশান্ত মহাসাগর
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনোগ্রাফিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নোয়া) তাদের সর্বশেষ পূর্বাভাসে জানিয়েছে, এক মাসের মধ্যেই এল নিনো আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে পারে।
সংস্থাটি আরও বলছে, চলতি শীতের মধ্যে এটি শক্তিশালী বা খুব শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা এখন তিন ভাগের দুই ভাগে পৌঁছেছে।
গত কয়েক সপ্তাহে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণতার যে গতি দেখা গেছে, সেটিকে অস্বাভাবিক বলছেন আবহাওয়াবিদেরা।
নোয়ার আবহাওয়াবিদ নাথানিয়েল জনসনের ভাষায়, বর্তমান গতিতে উষ্ণতা বাড়তে থাকলে এটি হবে ‘একটি বিরল ঘটনা’। কারণ, গত শীতে যে লা নিনা পরিস্থিতি ছিল- যা এল নিনোর বিপরীত ও শীতল প্রবণতা- সেখান থেকে মাত্র এক বছরের মধ্যে সম্ভাব্য শক্তিশালী এল নিনোতে পৌঁছানো খুবই অস্বাভাবিক।
অস্ট্রেলিয়ার ব্যুরো অব মেটিওরোলজি (বিওএম) এল নিনো নির্ধারণে কিছুটা কঠোর মানদণ্ড ব্যবহার করে। তাদের হিসাবে, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা গড়ের তুলনায় কমপক্ষে ০ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হতে হবে।
একই সঙ্গে তারা পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের বাণিজ্যিক বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তনও পর্যবেক্ষণ করে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে উষ্ণ সমুদ্র এখন বায়ুমণ্ডলেও প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।
সাধারণত বসন্তকালের এল নিনো পূর্বাভাস খুব নির্ভরযোগ্য হয় না। তবে এবার আবহাওয়াবিদেরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী।
‘সুপার এল নিনো’ কীভাবে নির্ধারণ করা হয়?
এল নিনো পুরো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগরজুড়ে তৈরি হলেও পূর্বাভাসদাতারা বিশেষভাবে ‘নিনো ৩.৪’ নামে পরিচিত একটি অঞ্চলের ওপর নজর রাখেন।
এ ক্ষেত্রে তিন মাসের গড় সমুদ্রপৃষ্ঠ তাপমাত্রা দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় কতটা বেশি, সেটি হিসাব করা হয়।
যখন এই তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়, তখন তাকে শক্তিশালী বা ‘সুপার এল নিনো’ বলা হয়।
ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর মিডিয়াম রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্টস (ইসিএমডব্লিউএফ), নোয়া ও অস্ট্রেলিয়ার বিওএম- তিনটি সংস্থার পূর্বাভাস প্রায় একই ধরনের ফলাফল দেখাচ্ছে।
ইসিএমডব্লিউএফের সর্বশেষ পূর্বাভাসে দেখা গেছে, তাদের অর্ধেকের বেশি মডেল শরৎ নাগাদ তাপমাত্রা ২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নোয়ার আবহাওয়াবিদ জনসনের মতে, এর চেয়ে বেশি তাপমাত্রা বৃদ্ধি হলে সেটি হবে ‘ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী ঘটনা’।
বিওএমের পূর্বাভাসেও এ বছরের শেষ দিকে খুব শক্তিশালী এল নিনো গড়ে ওঠার স্পষ্ট সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
কিছু পূর্বাভাস তথ্য এমনও ইঙ্গিত দিচ্ছে যে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসও ছাড়িয়ে যেতে পারে। তা হলে ১৮৭৭ সালে রেকর্ড হওয়া বর্তমান সর্বোচ্চ ২ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের রেকর্ডও ভেঙে যাবে।
তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, ১৮৭৭ সালের পর্যবেক্ষণব্যবস্থা সীমিত ছিল। তাই ওই সময়ের তথ্য নিয়ে এখনো কিছু অনিশ্চয়তা রয়েছে।
সেই এল নিনো প্রায় ১৮ মাস স্থায়ী হয়েছিল এবং তা ভয়াবহ বৈশ্বিক জলবায়ু বিপর্যয় ডেকে আনে। এতে এশিয়া, ব্রাজিল ও আফ্রিকায় ভয়াবহ খরা ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় এবং লাখো মানুষের মৃত্যু হয়। একই সময়ে পেরুর মতো অঞ্চলে তীব্র বন্যাও হয়েছিল।
সবশেষ ‘খুব শক্তিশালী’ এল নিনো হয়েছিল ২০১৫-১৬ সালে। তখন নভেম্বর-ডিসেম্বর-জানুয়ারি সময়ে নিনো ৩.৪ অঞ্চলের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি ছিল ২ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
কী হতে পারে এর প্রভাব?
পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে অতিরিক্ত তাপ জমা হওয়ার কারণে এল নিনোর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রায়। সাধারণত এটি বিশ্ব তাপমাত্রা প্রায় ০ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব রিডিংয়ের জলবায়ু ঝুঁকি ও সহনশীলতা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক লিজ স্টিফেন্স বিবিসিকে বলেন, এটি যদি খুব শক্তিশালী এল নিনো হয়, তাহলে আগামী বছর সম্ভবত আমরা রেকর্ড বৈশ্বিক তাপমাত্রা দেখতে যাচ্ছি।
২০২৩-২৪ সালের এল নিনোর পর বিশ্বে রেকর্ড উষ্ণ বছর দেখা গিয়েছিল। যদিও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সরাসরি প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, তবে প্রতিটি এল নিনো আলাদা বৈশিষ্ট্যের হয়। এর শক্তি ও বৈশ্বিক আবহাওয়ায় প্রভাবের ধরনও ভিন্ন হয়।
এল নিনোর কারণে উত্তর পেরু ও দক্ষিণ ইকুয়েডরে বন্যা সাধারণ ঘটনা। একই সঙ্গে পূর্ব আফ্রিকা, মধ্য এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলেও বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এটি আটলান্টিক অঞ্চলের ঘূর্ণিঝড়ও কমিয়ে দেয়। আবহাওয়াবিদেরা ইতিমধ্যে ইঙ্গিত দিচ্ছেন, এ বছরের আটলান্টিক হারিকেন মৌসুম স্বাভাবিকের তুলনায় শান্ত থাকতে পারে।
তবে অধ্যাপক স্টিফেন্স বলছেন, শুনতে এটি ভালো মনে হলেও মধ্য আমেরিকার জন্য এর অর্থ হলো অনেক কম বৃষ্টিপাত এবং সম্ভাব্য খরা পরিস্থিতি। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাঞ্চলের কিছু অংশে খরা ও দাবানলের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এতে কৃষি উৎপাদন ও বৈশ্বিক খাদ্য মজুত কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
‘বড় মানবিক বিপর্যয়’ নিয়ে সতর্কতা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সার সরবরাহে এরই মধ্যে বিঘ্ন ঘটছে ও সারের দামও বেড়েছে। এর প্রভাব আগামী মাসগুলোতে কৃষি উৎপাদনে পড়তে পারে। ফলে খাদ্য সরবরাহ কমে যাওয়া ও মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
অধ্যাপক স্টিফেন্স বলেন, আগেই দারিদ্র্যের মধ্যে থাকা মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। এর মধ্যে যদি এল নিনোর কারণে খরা বা বন্যায় ফসল উৎপাদন কমে যায়, তাহলে খাদ্যের দাম আরও বাড়বে।
তার ভাষায়, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট যদি চলতে থাকে, তাহলে এ বছর আমরা সম্ভাব্য বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারি।
যুক্তরাজ্যের আবহাওয়ার ওপর এল নিনোর সরাসরি প্রভাব কতটা পড়বে, তা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। তবে দেশটির আবহাওয়া অফিসের জলবায়ুবিজ্ঞানীরা বলছেন, এল নিনো বছরগুলো যুক্তরাজ্যে তুলনামূলক বেশি শীতল শীতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এমআই