জবি প্রতিনিধি:
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রনেতাদের নিয়ে আয়োজিত শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচির অংশ হিসেবে চীন সফরের জন্য ঘোষিত প্রতিনিধি দলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) ছাত্রদলের কোনো প্রতিনিধির নাম না থাকায় নেতাকর্মীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। বিশেষ করে সদ্য সমাপ্ত ঐতিহাসিক প্রথম জকসু (জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ) নির্বাচনে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে অংশগ্রহণকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে অন্যতম সেরা ফলাফল অর্জনের পরও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের এভাবে বাদ দেওয়াকে “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক আধিপত্য ও চরম বৈষম্যের বহিঃপ্রকাশ” হিসেবে দেখছেন তারা।
সম্প্রতি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত ২০ সদস্যের এক বিশেষ প্রতিনিধি তালিকায় দেখা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর একাধিক নেতাকর্মী স্থান পেলেও জকসু থেকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত কোনো প্রতিনিধিকে রাখা হয়নি। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
দলীয় ও ক্যাম্পাস সূত্রে জানা যায়, ২১ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হওয়া জকসু নির্বাচনে প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান’ প্যানেল থেকে সর্বোচ্চ ৪টি গুরুত্বপূর্ণ পদে (পরিবহন সম্পাদক পদে মো. মাহিদ হোসেন, পাঠাগার ও সেমিনার সম্পাদক পদে রিয়াসাল রাকিব,সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক পদে তাকরিমসহ (একজন কার্যনির্বাহী সদস্যসহ) ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করে ছাত্রদল। যেখানে ডাকসু, জাকসুর মতো বড় বড় ছাত্র সংসদগুলোর মধ্যে জবি ছাত্রদলের এই ৪ পদে জয়ী হওয়াকে দেশের ছাত্ররাজনীতিতে দলটির অন্যতম সেরা ও সফলতম ফলাফল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। অথচ আন্তর্জাতিক এই সফরের প্রতিনিধি নির্বাচনে জবি ছাত্রদলের সেই সফলতার বিন্দুমাত্র প্রতিফলন দেখা যায়নি।
নেতাকর্মীদের অভিযোগ, প্রকাশিত তালিকায় ডাকসু নির্বাচনে পরাজিত ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান ও জিএস প্রার্থী তানভীর বারী হামিমের নাম রহস্যজনকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেগম রোকেয়া হল ছাত্রদলের সভাপতি শ্রাবণী আক্তার, বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল ছাত্রদলের সভাপতি নওশিন তাবাসসুম অথৈ এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার শিক্ষার্থী বিষয়ক সম্পাদক সেলিমা বিনতে তারিন রোদসীর নামও রয়েছে ওই সফরে। এ নিয়ে জবি ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে—যেখানে এটি সম্পূর্ণ শিক্ষা ও ছাত্র নেতৃত্বভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক সরকারি কর্মসূচি, সেখানে সরাসরি সাধারণ ছাত্রদের ভোটে নির্বাচিত সফল প্রতিনিধিদের বাদ দিয়ে, পরাজিত কিংবা ছাত্র সংসদের বাইরে থাকা ব্যক্তিদের কোন নিয়মে অগ্রাধিকার দেওয়া হলো। অনেকেই আবার শিক্ষা ও ছাত্র নেতৃত্ব বিষয়ক এ ধরনের রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে যুবদল সংশ্লিষ্ট নেতাদের অন্তর্ভুক্তির যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
জবি ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল বলেন, "জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল দীর্ঘ প্রতিকূলতা পেরিয়ে একটি সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভোটে নিজেদের যোগ্যতা ও অবস্থান প্রমাণ করেছে। প্রথম জকসু নির্বাচনে সর্বোচ্চ সফলতা অর্জনের পরও আমাদের কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধিকে চীন সফরে না রাখা অত্যন্ত দুঃখজনক। তবে যেহেতু প্রতিনিধি নির্বাচন একটি চলমান প্রক্রিয়া, আমরা আশা করি পরবর্তী সময়ে সব বিষয় মূল্যায়ন করে কেন্দ্র থেকে এই বৈষম্য দূর করা হবে।"
অন্যদিকে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে সদস্য সচিব শামসুল আরেফিন বলেন, "আমরা দীর্ঘদিন ধরেই দেখে আসছি জাতীয় পর্যায়ের বড় বড় সুযোগ-সুবিধা ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সবসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক একটি বিশেষ আধিপত্য বজায় রাখা হয়। অথচ ঢাকার বুকেই অবস্থিত দেশের অন্যতম প্রধান বিদ্যাপীঠ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী, যোগ্য ও নির্বাচিত ছাত্রনেতাদের বারবার অবমূল্যায়ন করা হয়। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় কর্তৃক অনুমোদিত চীন সফরের এই পক্ষপাতমূলক তালিকা সেই দীর্ঘমেয়াদী বৈষম্যের কুৎসিত বাস্তবতাকেই আবার আমাদের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।"
জকসুর লাইব্রেরি ও পাঠাগার বিষয়ক সম্পাদক এবং জবি ছাত্রদলের আহ্বায়ক সদস্য রিয়াসাল রাকিব বলেন, "যারা সরাসরি হাজার হাজার সাধারণ শিক্ষার্থীর ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে পরাজিত প্রার্থীদের আন্তর্জাতিক সফরে পাঠানো সম্পূর্ণ অনৈতিক এবং এটি সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী। এই ধরনের একচোখা সিদ্ধান্তের কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝেও চরম নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছে।"
জকসুতে বিপুল ভোটে বিজয়ী পরিবহন সম্পাদক মো. মাহিদ হোসেন (যিনি বিগত স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ছাত্রলীগের ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন) মন্তব্য করেন, "জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় বরাবরই সব ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার এবং এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংগঠনিক অর্জন এবং সাধারণ ছাত্রদের দেওয়া রায়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল।"
জকসুর নবনির্বাচিত কার্যনির্বাহী সদস্য ও ছাত্রদলের আহ্বায়ক সদস্য সাদমান সাম্য বলেন, "নেতৃত্ব ও মেধা উন্নয়নমূলক একটি রাষ্ট্রীয় প্রোগ্রামে জকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের এভাবে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এতে তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মনে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সমতা নিশ্চিত করা জরুরি।"
এদিকে বিষয়টি নিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতে, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ের যেকোনো প্রতিনিধি দল গঠনে শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক প্রভাব বা বলয় ধরে না রেখে, দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক অর্জন, মেধা, যোগ্যতা ও প্রকৃত জনপ্রতিনিধিত্বকেও সমানভাবে মূল্যায়ন করা উচিত।
এমআই