ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম:
গতকাল রাতে ইরানের মিসাইলগুলো যখন ইসরাইলে আঘাত করছিল, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তখন বিখ্যাত সংবাদ মাধ্যম 'ফাইনান্সিয়াল টাইমস'-কে সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলেন। সেখানে ইসরাইলে ইরানের হামলা নিয়ে তাঁর মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে ট্রাম্প বলেন— "নেতানইয়াহু উইল হ্যাভ নো চয়েস বাট টু অ্যাকসেপ্ট ডিল।" (অর্থাৎ, চুক্তিটি মেনে নেওয়া ছাড়া নেতানিয়াহুর আর কোনো উপায় নেই)।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ট্রাম্প হঠাৎ কেন এই কথা বললেন? কারণ ট্রাম্প খুব ভালো করেই জানেন, ইরান গত কয়েকদিন ধরেই স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছিল— লেবাননের রাজধানী দক্ষিণ বৈরুত তাদের জন্য 'রেড লাইন'। ইসরাইল যদি সেখানে হামলা করে, তবে তারা সঙ্গে সঙ্গে এর তীব্র জবাব দেবে। আর গতকাল সন্ধ্যায় ইসরাইল ঠিক সেখানেই হামলা চালিয়েছিল।
দক্ষিণ বৈরুত কেন ইরানের কাছে 'রেড লাইন'?
ইরানের ইংরেজি দৈনিক 'তেহরান টাইমস'-এর একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল— "দ্য লেবানিজ গভর্নমেন্ট ইজ নট প্রোভাইডিং শেল্টার টু ইটস ওন পিপল।" (লেবানন সরকার তার নিজ দেশের জনগণকে আশ্রয় দিচ্ছে না)। প্রতিবেদনটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দক্ষিণ লেবাননের লিটানি নদী পর্যন্ত অঞ্চল ইসরাইল জোরপূর্বক দখলে নেওয়ায় লাখ লাখ মানুষবাস্তুচ্যুত হয়ে আশ্রয়ের খোঁজে লেবাননের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটছে। কিন্তু আমেরিকা ও ইসরাইলের প্রভাবে লেবানন সরকার এবং কাতার, আরব আমিরাত বা সৌদির মতো আরব অঞ্চলের এনজিওগুলোও তাদের আশ্রয় দিচ্ছে না; কারণ তারা মনে করছে এরা সবাই হিজবুল্লাহর সদস্য।
শেষ পর্যন্ত লেবাননের রাজধানী দক্ষিণ বৈরুতের 'দাহিয়া' অঞ্চলের সাধারণ জনগণ (যাদের বেশিরভাগই শিয়া জনগোষ্ঠী) এই বাস্তুচ্যুত মানুষদের আশ্রয় দেয়। গতকাল ইসরাইল মূলত এই আশ্রয় নেওয়া মানুষদের ওপরই বোমা বর্ষণ করেছে। এই নিরীহ মানুষদের রক্ষা করতেই ইরান গতকাল রাতে ইসরাইলে একের পর এক ঝাঁকে ঝাঁকে মিসাইল হামলা চালায়।
ট্রাম্পের অবস্থান ও নেতানিয়াহুর চাল
ইরানের এই বিধ্বংসী মিসাইল হামলার মুখে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করে লেখেন— "Israel should not retaliate" (ইসরাইল যেন পাল্টা হামলা না করে)। এমনকি নেতানিয়াহুর সাথে টেলিফোনে কথা বলার পর তিনি আবারও লেখেন, ইসরাইল আর হামলা চালাবে না। ফাইনান্সিয়াল টাইমসকে ট্রাম্প বুক ফুলিয়ে এও বলেন— "I call all the shots. He doesn't call the shots" (সবকিছু আমার নির্দেশেই চলে, নেতানিয়াহুর একা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই)।
কিন্তু এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভোরে ইসরাইল ইরানের বেশ কিছু জায়গায় পাল্টা হামলা চালায়। তাহলে কি নেতানিয়াহু ট্রাম্পের কথা শোনেননি? নাকি ট্রাম্প মুখে এক আর আড়ালে অন্য কথা বলছেন? পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ট্রাম্প পরে আবার পোস্ট করেন— "Israel and Iran should stop bombing each other" (ইসরাইল ও ইরানের উচিত একে অপরের ওপর বোমা হামলা বন্ধ করা)।
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মারান্ডি আজ একটি সাক্ষাৎকারে যথার্থই বলেছেন— "Iran has the upper hand, and that’s why Trump is asking Israel to stop bombing" (ইরান এখন সুবিধাজনক অবস্থানে আছে, আর এ কারণেই ট্রাম্প ইসরাইলকে হামলা বন্ধ করতে বারবার আহ্বান জানাচ্ছেন)। ইসরাইল যদি সত্যিই সুবিধাজনক অবস্থানে থাকত, তবে ট্রাম্প কি কখনো নেতানিয়াহুকে যুদ্ধ থামাতে বলতেন? কখনোই না। তুর্কি সংবাদ মাধ্যম টিআরটি (TRT) জানিয়েছে, ইরানের অন্তত ১০টি মিসাইল সরাসরি হাইফা এবং ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে ইসরাইলি সেটেলারদের দখলে থাকা অঞ্চলে আঘাত হেনেছে। পূর্ব জেরুজাлеমে থাকা বেলজিয়ান কনস্যুলেট অফিস আজ তাদের নাগরিকদের ওই অঞ্চলে ভ্রমণ না করার এবং embassy কর্মীদের শহরে বের হতে নিষেধ করেছে, যা ইরানের হামলার কার্যকারিতাই প্রমাণ করে।
আমেরিকার দ্বিধা ও ইরানের কৌশলগত শক্তি
আমেরিকান সামরিক বিশেষজ্ঞ কর্নেল ড্যানিয়েল ডেভিস পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেছেন— "Israel will now seek help from America for its security, because it is not possible for Israel alone to stand against Iran" (ইসরাইল এখন নিরাপত্তার জন্য আমেরিকার কাছে সাহায্য চাইবে, কারণ একা ইরানের বিরুদ্ধে টিকে থাকা ইসরাইলের পক্ষে সম্ভব না)। ইসরাইল মূলত এটাই চেয়েছিল— তারা বৈরুতে হামলা চালিয়ে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করতে চেয়েছে যাতে আমেরিকা বাধ্য হয়ে এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এবং কোনো শান্তি চুক্তি না হয়।
মার্কিন ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষক ত্রিতা পার্সি বিষয়টিকে চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প যদি এখন ইসরাইলের পাশে না দাঁড়ান, তবে লোকে বলবে তিনি ইসরাইলকে ত্যাগ করেছেন। আর যদি ইসরাইলের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে যান, তবে মার্কিনীরা বলবে ট্রাম্প ইসরাইলের কথায় ওঠবস করেন এবং ইসরাইলই আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে।
এদিকে ইয়েমেনের হুথিরা ঘোষণা করেছে, লোহিত সাগরের কৌশলগত 'বাব আল-মান্দেব' প্রণালি দিয়ে ইসরাইল ও তার মিত্রদের কোনো জাহাজ যেতে দেওয়া হবে না। অধ্যাপক মারান্ডি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ইরানে পুনরায় আঘাত এলে এই প্রণালি সবার জন্যই বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যার অর্থ পৃথিবীর প্রায় ৫০ শতাংশ তেল-গ্যাস সরবরাহ স্থবির হয়ে পড়া।
ইরানের সামরিক উত্থানের রহস্য: সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি
can বছরের পর বছর পশ্চিমা গণমাধ্যম ইরানকে একটি অনগ্রসর ও পশ্চাদপদ সমাজ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ইরানের সমাজ অত্যন্ত আধুনিক এবং শিক্ষাবান্ধব।
আমাদের সমাজে প্রায়ই দেখা যায়— "লোকে কী বলবে" এই ভয়ে তরুণরা তাদের মেধা বা ইচ্ছানুযায়ী কাজ করতে পারে না। উচ্চশিক্ষিত হয়ে কেউ মৎস্য চাষ বা নতুন কোনো উদ্যোগ নিতে গেলে সমাজ তাকে নিরুৎসাহিত করে। (এই সামাজিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে আমি আমার নতুন ইউটিউব চ্যানেলে আজ বিস্তারিত আলোচনা করেছি, ভিডিওর লিঙ্কটি কমেন্টে দিয়ে দেব, আশা করি দেখবেন)। কিন্তু ইরানি সমাজে মেধা ও নতুন আইডিয়াকে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা করে।
বাধার মাঝেও এই অভাবনীয় সামরিক প্রযুক্তির রহস্য জানতে চাওয়া হলে অধ্যাপক মারান্ডি হেসে বলেন— "আমরা চকচকে জিনিসে বিশ্বাসী নই, আমরা কাজে বিশ্বাসী। ইরানে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয় এবং তরুণদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে উৎসাহিত করা হয়।"
পরাশক্তি হিসেবে ইরানের আবির্ভাব
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেফ্রি স্যাক্স আজ জোর দিয়ে বলেছেন— ট্রাম্প যদি নিজের মুখ বাঁচাতে চান, তবে ইরান থেকে এখনই লেজ গুটিয়ে চলে আসতে হবে, নইলে বড্ড দেরি হয়ে যাবে।
লেখাটি শেষ করছি ইরানের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্রের আজকের একটি চূড়ান্ত বার্তা দিয়ে। তারা স্পষ্ট জানিয়েছে— "আমরা আপাতত ইসরাইলে হামলা বন্ধ করলাম। কিন্তু ইসরাইল যদি লেবানন বা ইরানে আবার হামলা করে, তবে ইসরাইলকে মাটির সাথে গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।"
যে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা ও ইসরাইল মিলে ইরানের সরকার উৎখাত ও তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ লুটপাটের উদ্দেশ্যে এই যুদ্ধ শুরু করেছিল, আজ পাশার দান সম্পূর্ণ উল্টে গেছে। গত সপ্তাহে আমি লিখেছিলাম, এই যুদ্ধের পর ইরান বিশ্ব পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে। কিন্তু আমি হয়তো কিছুটা ভুল ছিলাম; শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রবার্ট পেপ আজ যা বলেছেন, সেটাই সত্য— "ইরান এখনই পৃথিবীর পরাশক্তি।" হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির মাধ্যমে বিশ্বের অর্ধেক জ্বালানি সরবরাহের নিয়ন্ত্রণ এবং তাদের অবিশ্বাস্য মিসাইল প্রযুক্তি আজ পুরো পৃথিবীকে বিস্মিত করেছে।
লেখক: ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম
কলামিস্ট, সমাজসেবক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মী