মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬

বিয়ে, মাতৃত্ব ও চাকরি—সব বাধা পেরিয়ে গ্র্যাজুয়েট হলেন সংগ্রামী আয়েশা

মঙ্গলবার, জুন ৯, ২০২৬
বিয়ে, মাতৃত্ব ও চাকরি—সব বাধা পেরিয়ে গ্র্যাজুয়েট হলেন সংগ্রামী আয়েশা

সময় জার্নাল ডেস্ক:

বলা  হয়ে থাকে মন থেকে চাইলে আর লেগে থাকলে কোন কিছুই অর্জন করা অসম্ভব নয়। সেটাই যেন করে দেখিয়েছেন এক সংগ্রামী তরুণী। সমাজের প্রচলিত ধারণা হলো, বিয়ের পর মেয়েদের জন্য উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যাওয়া কঠিন, আর সন্তান হওয়ার পর সেই পথ আরও কঠিও এবং সংকীর্ণ হয়ে যায়। তবে সব বাধা ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করে নিজের স্বপ্ন পূরণের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন সরকারি তিতুমীর কলেজের রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী আয়েশা খানম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত সরকারি তিতুমীর কলেজের রসায়ন বিভাগ থেকে সম্প্রতি তিনি অনার্স সম্পন্ন করেছেন। নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া এই তরুণীর সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং অদম্য মানসিক শক্তির গল্প।

শৈশব থেকেই পড়াশোনার প্রতি ছিল তার গভীর মনোযোগ। অন্য সমবয়সীরা যখন খেলাধুলা বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত থাকত, তখন তিনি নিজেকে নিবেদিত রেখেছিলেন লেখাপড়ায়। তার বাবা-মা দুজনেই দর্জির কাজ করে সংসার চালালেও মেয়েকে শিক্ষিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতেন। সেই স্বপ্নকে নিজের লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে তিনি প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত সব বোর্ড পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেন।

তবে উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার সময় তার জীবনে আসে বড় এক মোড়। পারিবারিক সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নিজের সহপাঠীকে বিয়ে করেন তিনি। মাত্র ১৮ বছর বয়সে বিয়ের এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে চারপাশ থেকে নানা সমালোচনা ও নেতিবাচক মন্তব্য শুনতে হয় তাকে। অনেকে মনে করেছিলেন, একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন এখানেই শেষ হয়ে যাবে।

কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন ছিল। স্বামী-স্ত্রী দুজনই তখন শিক্ষার্থী। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও তারা পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। স্বামী একটি ছোট চাকরি করতেন, আর তিনি টিউশনি করে নিজের পড়াশোনার খরচ বহন করতেন। কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি উচ্চমাধ্যমিকে গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জন করেন এবং পরে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সরকারি তিতুমীর কলেজের রসায়ন বিভাগে ভর্তি হন।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম বছর ভালোভাবেই কাটছিল। কিন্তু প্রথম বর্ষের পরীক্ষার পর জানতে পারেন, তিনি মা হতে চলেছেন। সাধারণত এই পর্যায়ে অনেক নারীকে পড়াশোনা বন্ধ করতে বাধ্য হতে হয়। পরিবার, সন্তান ও শিক্ষাজীবনের ভারসাম্য রক্ষা করা তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

তবে তিনি হার মানেননি। গর্ভাবস্থাতেও নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যান। সন্তান জন্মের মাত্র সাত দিনের মাথায়, যখন পরিবারের সবাই নবজাতকের নামকরণ অনুষ্ঠানে ব্যস্ত, তখন তিনি নিজের দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষার ফরম পূরণ করেন। শারীরিকভাবে তখনও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি; হাঁটতেও অন্যের সহায়তা প্রয়োজন হতো।

এরপর আসে আরও কঠিন সময়। মাত্র ৪৫ দিনের শিশুকন্যাকে মায়ের কাছে রেখে টঙ্গী থেকে মিরপুরে গিয়ে পরীক্ষায় অংশ নেন তিনি। সিজারিয়ান অপারেশনের পর শরীরে বেল্ট বেঁধে, রাতের পর রাত নির্ঘুম থেকে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া ছিল তার জন্য এক কঠিন যুদ্ধ। নবজাতকের যত্ন, সংসারের দায়িত্ব এবং পড়াশোনার চাপ—সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হয়েছে তাকে।

অনেকের মতো তিনি চাইলে পড়াশোনা বন্ধ করে শুধু সংসার ও সন্তানকে সময় দিতে পারতেন। কিন্তু নিজের স্বপ্নকে থামতে দেননি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে কলেজের আইটি ক্লাবের মাধ্যমে বিভিন্ন অনলাইন কোর্স সম্পন্ন করে ডিজিটাল দক্ষতা অর্জন করেন। টিউশনি থেকে জমানো অর্থ দিয়ে একটি ল্যাপটপ কেনেন এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মজীবনে প্রবেশের প্রস্তুতি নেন।

তার সেই প্রস্তুতি সফলতাও এনে দেয়। মেয়ের বয়স যখন আট মাস, তখন তিনি একটি প্রতিষ্ঠানে রিমোট চাকরির সুযোগ পান। আইসিটি বাংলায় সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। দক্ষতা ও কর্মনিষ্ঠার স্বীকৃতি হিসেবে মাত্র তিন মাসের মধ্যে পদোন্নতি পেয়ে কো-অর্ডিনেটর হন। বর্তমানে তিনি একই প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করছেন।

একদিকে চাকরি, অন্যদিকে সন্তান লালন-পালন, সংসার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কঠিন একাডেমিক পড়াশোনা—সবকিছু একসঙ্গে সামলে তিনি শেষ পর্যন্ত অনার্স ডিগ্রি অর্জন করেছেন। একই সময়ে তার স্বামীও নিজের গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেছেন।

তবে এই সাফল্যের সবচেয়ে গর্বের দিক হলো, পুরো গ্র্যাজুয়েশন জীবন তিনি নিজের উপার্জিত অর্থে সম্পন্ন করেছেন। টিউশনি ও চাকরি থেকে পাওয়া অর্থের একটি অংশ নিয়মিত সঞ্চয় করে নিজের শিক্ষাজীবনের ব্যয় বহন করেছেন তিনি। ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার কথা মাথায় রেখে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার গুরুত্বও তিনি উপলব্ধি করেছেন।

তার এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের অসংখ্য নারীর জন্য একটি অনুপ্রেরণার বার্তা। বিয়ে, মাতৃত্ব কিংবা আর্থিক সীমাবদ্ধতা যে একজন নারীর শিক্ষাজীবন ও স্বপ্নপূরণের পথে চূড়ান্ত বাধা নয়, সেই সত্যকেই নতুন করে প্রমাণ করেছেন এই সংগ্রামী তরুণী।

আজ তিনি একজন মা, একজন স্ত্রী, একজন চাকরিজীবী এবং একজন গ্র্যাজুয়েট। তার গল্প বলে—পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, ইচ্ছাশক্তি, পরিশ্রম এবং লক্ষ্য স্থির থাকলে স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব।

সময় জার্নাল/এমআই 


Somoy Journal is new coming online based newspaper in Bangladesh. It's growing as a most reading and popular Bangladeshi and Bengali website in the world.

উপদেষ্টা সম্পাদক: প্রফেসর সৈয়দ আহসানুল আলম পারভেজ

যোগাযোগ:
এহসান টাওয়ার, লেন-১৬/১৭, পূর্বাচল রোড, উত্তর বাড্ডা, ঢাকা-১২১২, বাংলাদেশ
কর্পোরেট অফিস: ২২৯/ক, প্রগতি সরণি, কুড়িল, ঢাকা-১২২৯
ইমেইল: somoyjournal@gmail.com
নিউজরুম ই-মেইল : sjnewsdesk@gmail.com

কপিরাইট স্বত্ব ২০১৯-২০২৬ সময় জার্নাল