নিজস্ব প্রতিবেদক:
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া দুই হাজার ৫৬৯ প্রার্থীর মধ্যে নারী ১০৭ জন। মোট প্রার্থীর মাত্র ৪ দশমিক ২৬ শতাংশ নারী। ১০৭ জনের মধ্যে দলীয় প্রার্থী ৬৭ জন। অন্যরা স্বতন্ত্র। বিএনপি সর্বোচ্চ ১১ নারীকে মনোনয়ন দিয়েছিল। দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে এই সংখ্যা কমে হয়েছে ১০। জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলনসহ ধর্মভিত্তিক দলগুলো একজনও নারী প্রার্থী দেয়নি। এই দলগুলোর নির্বাচনী সঙ্গী এনসিপির ৪৪ প্রার্থীর তিনজন নারী।
নারী প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে সম্পদশালী মানিকগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির মনোনীত আফরোজা খানম রিতা। তাঁর বার্ষিক আয় এক কোটি ৬০ লাখ ৯৮ হাজার ৬৩৮ টাকা। অস্থাবর সম্পদের বাজারমূল্য ৮৫ কোটি ৭২ লাখ ১৪ হাজার ৫৯৮ টাকা। স্বর্ণ আছে ১৬৪ ভরি। স্থাবর সম্পদ রয়েছে ১১ কোটি ৩৮ লাখ ৩১ হাজার টাকার।
আয়ে তাঁর পরই রয়েছেন বিএনপির সাবেক এমপি রুমিন ফারহানা। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় বিএনপি থেকে বহিষ্কার হয়েছেন। তাঁর বার্ষিক আয় ৯৮ লাখ টাকার বেশি।
ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন জামায়াতের সঙ্গে জোটের কারণে এনসিপি থেকে পদত্যাগ করা ডা. তাসনিম জারা। তাঁর প্রায় ২০ লাখ টাকার সম্পদ রয়েছে। বার্ষিক আয় সাত লাখ টাকার বেশি।
কথা রাখেনি দলগুলো
রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষর করা জুলাই সনদে প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এবারের সংসদ নির্বাচনে অন্তত ৫ শতাংশ আসনে নারীদের মনোনয়ন দেওয়া হবে। সংবিধান সংস্কার না হওয়ায়, এবারের জন্য বিধানটি থাকবে ‘জেন্টলম্যান এগ্রিমেন্ট’ হিসেবে। সব দল তা মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। পরের সংসদে নির্বাচনে ১০ শতাংশ আসনে নারী প্রার্থী দেবে দলগুলো। সংসদে ৩৩ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত প্রতি নির্বাচনে নারীদের মনোনয়ন ৫ শতাংশ করে বৃদ্ধি করা হবে। তবে কোনো দলই ‘জেন্টলম্যান এগ্রিমেন্ট’ রক্ষা করেনি।
বিএনপির দলীয় ২৯২ প্রার্থীর মধ্যে ১০ জন নারী, তা ৩ দশমিক ৪২ শতাংশ। ধানের শীষের নারী প্রার্থীরা হলেন– নাটোর-১ ফারজানা শারমিন, যশোর-২ মোছা. সাবিরা সুলতানা, ঝালকাঠি-২ ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টু, শেরপুর-১ সানসিলা জেবরিন, মানিকগঞ্জ-৩ আফরোজা খান রিতা, ঢাকা-১৪ সানজিদা ইসলাম তুলি, ফরিদপুর-২ শামা ওবায়েদ, সিলেট-২ মোছা. তাহসিনা রুশদীর, ফরিদপুর-৩ নায়াব ইউসুফ কামাল এবং মাদারীপুর-১ আসনে নাদিরা মিঠু।
ঐকমত্য কমিশনের সংলাপে এনসিপির প্রস্তাব ছিল অন্তত ১০ শতাংশ নারী প্রার্থী দিতে হবে। তবে দলটির ৪৪ প্রার্থীর মাত্র তিনজন নারী। তারা হলেন– ঝালকাঠি-১ ডা. মাহমুদা মিতু, ঢাকা-১৯ দিলশানা পারুল এবং ঢাকা-২০ নাবিলা তাসনিদ। জামায়াতের সঙ্গে ৩০ আসনে সমঝোতা হয়েছে দলটির। এই তিন নারীও রয়েছেন ৩০ আসনের মধ্যে। ফলে এনসিপির ১০ শতাংশ আসনে নারী প্রার্থী থাকতে পারেন।
অন্যান্য দলের মধ্যে জাতীয় পার্টি (জি এম কাদের) পাঁচজন, গণসংহতি আন্দোলন চার, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি তিন এবং গণঅধিকার পরিষদ তিন নারী প্রার্থী দিয়েছে। তবে এবি পার্টি জামায়াত জোটে এবং গণসংহতি আন্দোলন ও গণঅধিকার পরিষদ বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে থাকায় এসব আসনে নারীদের শেষ পর্যন্ত নির্বাচন করার সম্ভাবনা কম।
রুমিনের আয় বেড়েছে ২২ গুণ
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানার মালিকানায় রয়েছে–ধানমন্ডির ল্যাবরেটরি রোডে পাঁচ কাঠা জমি, লালমাটিয়ায় পাঁচ কাঠা জমি ও পাঁচটি ফ্ল্যাট। উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি এসব পেয়েছেন। তাই দাম দেখাননি।
রুমিন ফারহানার ঢাকার পল্টনে এক হাজার ২৫৮ বর্গফুটের বাণিজ্যিক স্পেস রয়েছে। হলফনামায় দাম দেখিয়েছেন ৬৫ লাখ টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আয়কর রিটার্ন অনুযায়ী তাঁর আয় ৯৭ লাখ ১৪ হাজার টাকা। ২০১৯ সালে জমা দেওয়া হলফনামায় আয় ছিল চার লাখ ৩৪ হাজার টাকা। ছয় বছর আয় বেড়েছে ২২ গুণ।
পেশায় আইনজীবী রুমিনের নগদ ও ব্যাংকে আছে ৩২ লাখ ১৪ হাজার টাকা। ১০ ভরি স্বর্ণালংকার উপহার হিসেবে পাওয়ার কথা জানিয়েছেন হলফনামায়।
অনুদানের টাকায় নির্বাচন করবেন জারা
তাসনিম জারা ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে নির্বাচনের জন্য ৪৭ লাখ টাকা গণচাঁদা তুলেছিলেন। সেই টাকায় নির্বাচন করার কথা জানিয়েছেন হলফনামায়। তিনি তথ্য দিয়েছেন, স্থাবর সম্পত্তি নেই। অস্থাবর সম্পত্তির মূল্য ২২ লাখ ৩০ হাজার ১৯০ টাকা। তবে করযোগ্য সম্পদের পরিমাণ ১৯ লাখ ১০ হাজার ৫০৯ টাকা। ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী জারার অলংকার আছে আড়াই লাখ টাকার। ব্যাংকে নিজ নামে জমা আছে ১০ হাজার ১৯ টাকা, হাতে নগদ আছে ১৬ লাখ টাকা ও ২ হাজার ২৭০ ব্রিটিশ পাউন্ড।
এনসিপি থেকে সদ্য পদত্যাগ করা জারার স্বামী খালেদ সাইফুল্লাহর হাতে নগদ আছে ১৫ লাখ টাকা ও ছয় হাজার ব্রিটিশ পাউন্ড।
ধনাঢ্য আফরোজা খানম
মানিকগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী আফরোজা খানম রিতা মুন্নু গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান। হলফনামায় দেওয়া তথ্যানুযায়ী তাঁর বার্ষিক আয় এক কোটি ৬০ লাখ ৯৮ হাজার ৬৩৮ টাকা। শিক্ষাগত যোগ্যতা বিকম (অনার্স)। তাঁর বিরুদ্ধে ৯টি মামলা রয়েছে। রিতার অস্থাবর সম্পদের বাজারমূল্য ৮৫ কোটি ৭২ লাখ টাকা। তাঁর হাতে নগদ টাকা রয়েছে পাঁচ কোটি ৮৬ লাখ। স্বর্ণ রয়েছে ১৬৪ ভরি। স্থাবর সম্পদ ১১ কোটি ৩৮ লাখ টাকার। ব্যাংক ঋণ ২০ কোটি ২৭ লাখ ৬১ হাজার ৩৪৩ টাকা।
২৭০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট প্রিয়াঙ্কার
যুক্তরাজ্যের ডিগ্রিধারী সানসিলা সাবরিন প্রিয়াঙ্কা পেশায় চিকিৎসক। বিএনপির এই প্রার্থীর বিরুদ্ধে মামলা নেই। তাঁর বার্ষিক আয় প্রায় সাত লাখ টাকা। হলফনামায় প্রিয়াঙ্কা উল্লেখ করেছেন, তাঁর হাতে আছে ২৯ লাখ ৭৩ হাজার টাকা। বিয়ের সময় তিনি ৬০ ভরি স্বর্ণালংকার উপহার পেয়েছেন। তাঁর স্বামীর স্বর্ণালংকার রয়েছে ৫০ ভরি। তাঁর অস্থাবর সম্পদ নেই। তবে স্থাবর সম্পদ হিসেবে বাবার কাছ থেকে পাওয়া ঢাকার মিরপুরে দুই ইউনিটের দুই হাজার ৭০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট রয়েছে।
শামা ওবায়েদের স্থাবর সম্পদ ৯ কোটি টাকার
ফরিদপুর-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী শামা ওবায়েদের পেশা ব্যবসা। এলিউর বিল্ডার্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তিনি। তাঁর বার্ষিক আয় ২১ লাখ ৮৯ হাজার টাকা। চার কোটি ৩৭ লাখ ৮৫ হাজার ৮০৬ টাকার অস্থাবর সম্পদের মালিক তিনি। ৩০ লাখ টাকা দামের জিপ গাড়িও রয়েছে। স্থাবর সম্পদের বর্তমান মূল্য ৯ কোটি টাকা। বনানীতে তিন হাজার ২৪৫ বর্গফুটের ফ্ল্যাট আছে তাঁর। শামার বিরুদ্ধে ১৭টি মামলা ছিল। এগুলো থেকে খালাস ও অব্যাহতি পেয়েছেন।
তাহসিনা রুশদীর আয় পেনশন ও সঞ্চয়পত্র থেকে
গুম হওয়া বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ডেপুটি রেজিস্ট্রার। সিলেট-২ আসনের এই প্রার্থী হলফনামায় লিখেছেন, তাঁর আয়ের উৎস পেনশন ও সঞ্চয়পত্র। বার্ষিক আয় ৯ লাখ ৫২ হাজার ৩৮৭ টাকা। প্রায় দেড় কোটি টাকার অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। বৈবাহিক সূত্রে পাওয়া ৪০ ভরি স্বর্ণালংকার আছে। প্রায় ছয় একর কৃষি জমির মালিক তিনি।
তিন ব্যবসায়ী নারী, আয় মাসে লাখের কম
নাদিরা মিঠুর হলফনামা অনুযায়ী তিনি ব্যবসায়ী। মাদারীপুর-১ আসনে ধানের শীষের এই প্রার্থীর বার্ষিক আয় ১০ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। এক কোটি ৭২ লাখ ৩৭ হাজার টাকার অস্থাবর সম্পদ রয়েছে তাঁর। রাজধানীর খিলগাঁও ও নিউ ইস্কাটনে দুটি ফ্ল্যাটের মালিক তিনি।
যশোর-২ আসনের সাবিরা সুলতানার শিক্ষাগত যোগ্যতা উচ্চ মাধ্যমিক। হলফনামা অনুযায়ী তাঁর পেশা গৃহিণী, ব্যবসা ও সমাজসেবা। তাঁর বার্ষিক আয় ছয় লাখ ৭৭ হাজার ১৭৯ টাকা। স্থাবর ও অস্থাবর মিলিয়ে বর্তমান বাজারমূল্যে তিনি পাঁচ কোটি টাকা সম্পদের মালিক।
ঝালকাঠি-২ আসনের ইলেন ভুট্টোর বার্ষিক আয় ছয় লাখ ৭৩ হাজার ৪৫৩ টাকা। হলফনামা অনুযায়ী তাঁর পেশা ব্যবসা। ফরিদপুর-৩ আসনের নায়াব ইউসুফের পেশাও ব্যবসা। তাঁর বার্ষিক আয় আট লাখ ৯৫ হাজার টাকা। স্থাবর সম্পদের মূল্য প্রায় পাঁচ কোটি টাকা।
একে