নিজস্ব প্রতিবেদক:
জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগের ১৭ নম্বর শয্যায় যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল এক বছরের শিশু অরণ্য বর্মণ। গরম পানিতে তার প্রায় ১১ শতাংশ ঝলসে গেছে। সন্তানের কান্না থামাতে পারছেন না মা সুস্মিতা রানী। গত মঙ্গলবার দুপুর দেড়টার দিকে ইনস্টিটিউটে গিয়ে এমন দৃশ্য চোখে পড়ে।
সুস্মিতা রানী জানান, শীতের শুরু থেকেই শিশুকে দুধ গরম করে খাওয়ানো হচ্ছিল। প্রতিদিনের মতো গত ২৫ ডিসেম্বর রাতে দুধের সঙ্গে মেশানোর জন্য পানি ফুটিয়ে টেবিলের ওপর রাখা হয়। এ সময় টেবিলের ওপর বিছানো কাপড় টেনে ধরে অরণ্য। মুহূর্তেই পাত্রের ফুটন্ত পানি তার মাথা, মুখ, বুক ও কাঁধে পড়ে যায়। এতে এক চোখ, মুখ ও কানে গুরুতর ক্ষত তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, ৬৫ বছরের নওগাঁর বুলবুলি বেগম ১৫ দিন ধরে বার্ন ইনস্টিটিউটের আইসিইউতে ভর্তি। গোসলের গরম পানিতে তাঁর শরীরের ২০ শতাংশের বেশি ঝলসে গেছে। পরিবারের সদস্যরা জানান, তাঁকে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বাড়িতে পাঠানো হয়। তবে অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়।
তথ্য বলছে, শীত মৌসুম শুরুর পর হাসপাতালে পোড়া রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের এক হিসাবে দেখা গেছে, দিনে গড়ে ২৪২ জন রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। তবে শীতের কারণে পোড়া রোগী বাড়লেও সঠিক পরিসংখ্যান হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে নেই।
বার্ন ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকরা বলছেন, পোড়া রোগীর চিকিৎসায় প্রথম ৬ থেকে ২৪ ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা ‘গোল্ডেন আওয়ার’ নামে পরিচিত। তবে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে অন্তত ৫০ শতাংশ রোগী সময়মতো চিকিৎসা পাচ্ছেন না। এতে জটিলতা বাড়ছে, অনেক ক্ষেত্রে প্রাণহানির ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
বার্ন ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকদের ভাষ্য, শীতকালে উষ্ণতা পেতে আগুনের ব্যবহার বেড়ে যায়। রান্নার চুলায় আগুন পোহানো, কাপড় শুকানো, গরম পানি ব্যবহার– এসব থেকে ঘটছে দুর্ঘটনা। কেউ গরম পানি, চা, দুধ বা তরকারিতে পুড়ছেন; কেউ গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ বা বিদ্যুৎস্পর্শে দগ্ধ হচ্ছেন। অনেক রোগীর শরীরের ৩০ থেকে ৭০ শতাংশ পুড়ে যাচ্ছে।
জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক শাওন বিন রহমান বলেন, সাধারণত দেশে সবচেয়ে বেশি দগ্ধের ঘটনা ঘটে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটে। এ ছাড়া রয়েছে গরম তরলে পুড়ে যাওয়া (স্ক্যাল্ড বার্ন), সরাসরি আগুনে পোড়া (ফ্লেম বার্ন) ও রাসায়নিক দগ্ধ। তবে এখন শীতের সময় গরম পানি ও আগুন পোহাতে গিয়ে দগ্ধের ঘটনা বেশি ঘটছে।
গত বছর চিকিৎসা নিয়েছেন ৮৮ হাজার দগ্ধ
বার্ন ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা গেছে, গত বছর জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৮৮ হাজার ২৩০ জন দগ্ধ রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। সে হিসাবে বার্ন ইনস্টিটিউটে দিনে চিকিৎসা নিতে এসেছেন ২৪২ জন।
এর মধ্যে গত জানুয়ারিতে চিকিৎসা নিয়েছেন ৮ হাজার ১৭৪ জন ও ভর্তি হন ২৬৭ জন। ফেব্রুয়ারিতে চিকিৎসা নেন ৭ হাজার ৩৩৭ জন ও ভর্তি হন ২৭৪ জন। মার্চে চিকিৎসা নেন ৬ হাজার ২৭১ জন ও ভর্তি হন ১৭৮ জন। এপ্রিলে চিকিৎসা নেন ৭ হাজার ৪৯৭ জন ও ভর্তি হন ৩৫১ জন। মে মাসে চিকিৎসা নেন ৭ হাজার ৩১৯ এবং ভর্তি হন ২০৯ জন। জুনে চিকিৎসা নেন ৬ হাজার ১৭৬ জন ও ভর্তি হন ২৮৯ জন। জুলাইয়ে চিকিৎসা নেন ৭ হাজার ৫৫ জন ও ভর্তি হন ২৬৬ জন। আগস্টে চিকিৎসা নেন ৭ হাজার ৮৪ জন ও ভর্তি হন ২৬৫ জন। সেপ্টেম্বরে চিকিৎসা নেন ৭ হাজার ৬৪৭ ও ভর্তি হন ২৮৯ জন। অক্টোবরে চিকিৎসা নেন ৭ হাজার ৮১৮ জন ও ভর্তি হন ৩৪৯ জন। নভেম্বরে চিকিৎসা নেন ৭ হাজার ৮৬৭ জন ও ভর্তি হন ৩৬৪ জন। ডিসেম্বরে চিকিৎসা নেন ৮ হাজার ৭৫ ও ভর্তি হন ৪১০ জন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ৫০০ শয্যার জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের ২০ শয্যার আইসিইউ, ২২ শয্যার মেল এইচডিইউ এবং ৩০ শয্যার ফিমেল এইচডিইউসহ মোট ৭২টি নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র রয়েছে। শীতে দুর্ঘটনা বাড়ায় গড়ে দৈনিক গড়ে ৪০ থেকে ৫০ জন রোগী ভর্তি হচ্ছে। এর মধ্যে ৪০ শতাংশ ঢাকার বাইরে থেকে আসছে। দগ্ধদের ৬০ শতাংশই শিশু ও নারী। ঢামেকের ১০০ শয্যার বার্ন ইনস্টিটিউটেও প্রায় সমান সংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন।
চিকিৎসাকেন্দ্রের সংকট ও দীর্ঘ চিকিৎসা
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মাত্র ১৭টি হাসপাতালে দগ্ধ রোগীর চিকিৎসা দেওয়া হয়, যেখানে চিকিৎসক আছেন প্রায় ১০০ জন। জেলা ও উপজেলা সরকারি হাসপাতালে পোড়া রোগীর জন্য কোনো সৃষ্ট পদ নেই। ফলে গোল্ডেন আওয়ারে চিকিৎসা না পেয়ে অনেক রোগীর মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে, কেউ কেউ আজীবন পঙ্গুত্ব বরণ করছেন।
জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও সার্জারি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন বলেন, শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দগ্ধ রোগীর ভিড় বেড়েছে হাসপাতালে, বিশেষ করে শিশুরা আসছে গরম পানিতে দগ্ধ হয়ে। আর বয়স্ক ও নারীরা আসছেন আগুন পোহাতে গিয়ে দগ্ধ হয়ে। পোড়া কোনো রোগ নয়, এটি দুর্ঘটনা। প্রতিবছর দেশে কয়েক লাখ মানুষ অগ্নিদুর্ঘটনার শিকার হয়। অনেকের চিকিৎসা দুই বছর পর্যন্ত চলতে পারে। কিন্তু উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে এখনও কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। এই কারণে ঢাকাতে রোগীর চাপ বাড়ছে।
তিনি বলেন, শীতকালে রান্না শেষে গরম হাঁড়ি-পাতিল কখনোই মেঝেতে রাখা যাবে না। এগুলো শিশুদের নাগালের বাইরে রাখতে হবে। গোসলের জন্য গরম পানির পাতিল বাথরুমে না নিয়ে রান্নাঘর থেকে বালতিতে পানি নেওয়া নিরাপদ। কেউ দগ্ধ হলে সঙ্গে সঙ্গে পোড়া স্থান ঠান্ডা পানিতে ২০ থেকে ৩০ মিনিট ধুয়ে নিতে হবে। বরফ ব্যবহার করা যাবে না। এরপর দ্রুত কাছাকাছি হাসপাতালে নিতে হবে।
পাঁচ মেডিকেল কলেজে বার্ন ইউনিটের পরিকল্পনা
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, পোড়া রোগীকে দ্রুত সেবা দিতে সিলেট, বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী ও ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে প্রকল্পটি নানা জটিলতায় পিছিয়ে যাচ্ছে। সংশোধিত প্রস্তাবে খরচ ধরা হয়েছে ৮১৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা। মেয়াদ বাড়িয়ে তা ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
একে