সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

লক্ষ্মীপুরে এলো ফ্রান্সের তরুণী, বিষয় প্রেম!

রোববার, জানুয়ারী ১১, ২০২৬
লক্ষ্মীপুরে এলো ফ্রান্সের তরুণী, বিষয় প্রেম!

অ আ আবীর আকাশ, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি:

ভালোবাসা কখনো সীমান্ত মানে না, মানে না ভাষা কিংবা সংস্কৃতির পার্থক্য। ফ্রান্সের এক তরুণী ও বাংলাদেশের লক্ষ্মীপুরের এক তরুণের ভালোবাসার গল্প যেন তারই বাস্তব প্রমাণ। ভিন্ন দেশ, ভিন্ন ভাষা ও ভিন্ন সংস্কৃতি পেরিয়ে গড়ে ওঠা এই ভালোবাসা আজ পরিণত হয়েছে সুখী দাম্পত্য জীবনে।

লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার রাজিবপুর এলাকার সমসের উদ্দিন খলিফা বাড়ির মৃত তাজুল ইসলামের ছেলে আরিফুল ইসলাম রাসেল ২০১১ সালে উচ্চ শিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে যান। সেখান থেকে ২০১৩ সালে তিনি পড়ালেখার উদ্দেশ্যে ফ্রান্সে চলে যান। ফ্রান্সেই তার পরিচয় হয় সিনথিয়া ইসলামের সঙ্গে। পড়ালেখার সূত্রে শুরু হওয়া পরিচয় ধীরে ধীরে রূপ নেয় গভীর সম্পর্কে।

ভাষাগত জটিলতা ছিল তাদের সম্পর্কের শুরুতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ইংরেজি জানা থাকলেও ফ্রান্সের মানুষ মূলত ফরাসি ভাষায় কথা বলেন। ফলে সিনথিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করতে রাসেলকে প্রায়ই গুগল ট্রান্সলেটের সহায়তা নিতে হতো। প্রায় এক বছর সময় লেগেছে এই ভাষাগত বাধা কাটিয়ে উঠতে। একপর্যায়ে সিনথিয়ার মধ্যেও বাংলা ভাষা শেখার আগ্রহ তৈরি হয়। ভাষা না মিললেও মনের মিলনে তাদের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে।

রাসেল জানান, একসময় তিনি সিনথিয়ার এক বান্ধুবিকে প্রেমের প্রস্তাব দিতে গিয়েছিলেন। কিন্তু ঘটনাস্থলে সিনথিয়ার হাসিতেই যেন আটকে যান তিনি। মনে মনে ভাবেন, যদি সিনথিয়া তার জীবনে আসে, তবে সেটাই হবে সবচেয়ে ভালো। আল্লাহর অশেষ রহমতে সেই ভাবনাই একসময় বাস্তবতায় রূপ নেয়। প্রেমের সম্পর্ক থেকে তারা আজ স্বামী-স্ত্রী।

বিয়ের বিষয়ে প্রথমে সিনথিয়ার বাবা রাজি হননি। তখন তার বয়স ছিল ১৮ বছর। যদিও ইউরোপে এই বয়সেই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা রয়েছে, তবুও পরে বাবাকে রাজি করিয়ে সিনথিয়া বাংলাদেশে আসেন। ২০১৭ সালে লক্ষ্মীপুরে এসে তিনি খ্রিষ্টান ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তার নাম পরিবর্তন হয়ে অম থেকে রাখা হয় সিনথিয়া ইসলাম। এরপর ইসলামি শরিয়াহ মোতাবেক রাসেল ও সিনথিয়ার বিয়ে সম্পন্ন হয়। এ পর্যন্ত সিনথিয়া পাঁচবার শ্বশুরবাড়ি লক্ষ্মীপুরে এসেছেন।

বর্তমানে সিনথিয়া ও রাসেল দুই সন্তানের বাবা-মা। তাদের বড় মেয়ে আমেনা ইসলাম (৬) ও ছোট ছেলে আলিফ ইসলাম (৪)। আমেনা নামটি রাখা হয়েছে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মায়ের নামে, যা মেয়ের মায়েরই পছন্দ। ছেলে আলিফের বাংলা ভাষায় কিছুটা দুর্বলতা রয়েছে বলে জানান রাসেল। তিনি বলেন, কাজের ব্যস্ততার কারণে সন্তানদের বাংলা শেখানোর ক্ষেত্রে তিনি নিজেকে কিছুটা ব্যর্থ মনে করেন। তবে রক্তের টানেই একদিন তারা বাংলা ভাষা শিখবে—এ বিশ্বাস তার।

সম্প্রতি রাসেল স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুরে এসেছেন। সেখানে সিনথিয়াকে দেখা গেছে কখনো মেঠোপথে হাঁটতে, কখনো হাওয়াই মিঠাই খেতে, আবার কখনো স্থানীয়দের সঙ্গে গল্পে মেতে উঠতে। বিদেশি হয়েও গ্রামীণ পরিবেশ ও মানুষের আন্তরিকতায় মুগ্ধ এই ফরাসি তরুণী। মেঘনা নদীর তীরসহ লক্ষ্মীপুরের বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্র ঘুরে দেখার পাশাপাশি তারা কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতও ভ্রমণ করেছেন। সেই আনন্দঘন মুহূর্তগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরেছেন তারা।

রাসেল জানান, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের সংস্কৃতি বিদেশে তুলে ধরা এবং বিদেশ থেকে বাংলাদেশকে উপস্থাপনের উদ্দেশ্যে ‘রাসেল এন্ড সিনথিয়া’ নামে একটি ফেসবুক পেইজ চালু করেন তারা। পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে পরিচিতি ও যোগাযোগ বাড়ানোও ছিল এই উদ্যোগের লক্ষ্য। বর্তমানে পেইজটিতে প্রায় ২.১ মিলিয়ন ফলোয়ার রয়েছে। এর মধ্যে ৪০ শতাংশ বাংলাদেশি এবং ৬০ শতাংশ বিদেশি। সবচেয়ে বেশি ফলোয়ার রয়েছে আরব দেশগুলো থেকে।

তিনি বলেন, “একজন মানুষ কখনোই পারফেক্ট না। আমাদেরও ভুল থাকতে পারে। তবুও বাংলাদেশের মানুষ যেভাবে আমাদের ভালোবাসা দিয়েছে, তা আমরা কল্পনাও করিনি।”

কন্টেন্ট ক্রিয়েশন প্রসঙ্গে রাসেল বলেন, সব কন্টেন্ট তৈরির কাজ তিনিই করেন, তবে মাঝে মাঝে সিনথিয়া আইডিয়া দেন। মানুষের কাছে সিনথিয়ার স্বাভাবিক আচরণ ও কথাবার্তাই সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে। ভালোবাসা পেতে হলে কিছুটা সেক্রিফাইস করতেই হয় বলেও তিনি মনে করেন।

অনেকে প্রশ্ন করেন, লক্ষ্মীপুরের বাসিন্দা হয়েও কেন তারা নোয়াখালীকে বেশি উপস্থাপন করেন। এ বিষয়ে রাসেল বলেন, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও ফেনী একই অঞ্চলের সন্তান। নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষা দেশ-বিদেশে পরিচিত হওয়ায় সেই ভাষায় মানুষের কথা তুলে ধরতেই তারা বেশি আগ্রহী।

সিনথিয়ার পারিবারিক জীবনের কথাও জানান রাসেল। ছোটবেলায় সিনথিয়ার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়ে যায়। মায়ের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত সিনথিয়া সেই শূন্যতা রাসেলের মায়ের কাছ থেকে পূরণ করছে। এ কারণেই সে বারবার বাংলাদেশে ফিরে আসতে চায় বলে জানান তিনি।

ফরাসি ভাষায় সিনথিয়া অ আ আবীর আকাশকে বলেন, বাংলাদেশে পরিবারের বন্ধন ও মানুষের পারস্পরিক ভালোবাসাই তাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছে। বিদেশে এমন দৃশ্য খুব একটা দেখা যায় না। এ দেশের সামাজিকতা তার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। বাংলা ভাষায় নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমার দেশ বাংলাদেশ।” শাশুড়ির হাতে বানানো পিঠা তার সবচেয়ে পছন্দের খাবার। নিরহংকারী ও সহজ-সরল এই ফরাসি তরুণী অল্প সময়েই সবার সঙ্গে আপন হয়ে উঠেছেন।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে রাসেল বলেন, “আমার মাতৃভূমি বাংলাদেশ। এখানে আমাকে আসতেই হবে। আবার আমার বাচ্চাদের মায়ের দেশ ফ্রান্স, সেটাও ভুলে যাওয়ার সুযোগ নেই। ভবিষ্যতে যদি ব্যবসা করতে পারি, তাহলে ছয় মাস বাংলাদেশে ও ছয় মাস ফ্রান্সে থাকার ইচ্ছা আছে। এতে সন্তানরা দুই দেশের সংস্কৃতিই শিখতে পারবে।”

ভালোবাসা, বিশ্বাস আর মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতার মধ্য দিয়েই সিনথিয়া ও রাসেলের সংসার আজ সুখী—এমনটাই জানান রাসেল।

্এমআই 


Somoy Journal is new coming online based newspaper in Bangladesh. It's growing as a most reading and popular Bangladeshi and Bengali website in the world.

উপদেষ্টা সম্পাদক: প্রফেসর সৈয়দ আহসানুল আলম পারভেজ

যোগাযোগ:
এহসান টাওয়ার, লেন-১৬/১৭, পূর্বাচল রোড, উত্তর বাড্ডা, ঢাকা-১২১২, বাংলাদেশ
কর্পোরেট অফিস: ২২৯/ক, প্রগতি সরণি, কুড়িল, ঢাকা-১২২৯
ইমেইল: somoyjournal@gmail.com
নিউজরুম ই-মেইল : sjnewsdesk@gmail.com

কপিরাইট স্বত্ব ২০১৯-২০২৬ সময় জার্নাল