অ আ আবীর আকাশ:
কিছু মানুষ ইতিহাসের পাতায় নাম লেখান, আর কিছু মানুষ ইতিহাস নিজ হাতে গড়ে যান। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষ। তার জন্ম হয়েছিল কেবল জীবনযাপনের জন্য নয়, জন্ম হয়েছিল একটি জাতির ভাগ্য নির্মাণের দায়িত্ব নিয়ে। তিনি ইতিহাস পড়ার জন্য জন্মাননি, ইতিহাস সৃষ্টি করতেই পৃথিবীতে এসেছিলেন। ব্যক্তিগত স্বার্থ, পারিবারিক নিরাপত্তা কিংবা ক্ষমতার মোহ তাকে কখনো স্পর্শ করতে পারেনি। তার ভালোবাসা সীমাবদ্ধ ছিল না নিজ গণ্ডিতে; তা ছড়িয়ে পড়েছিল বাংলাদেশের ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের প্রতিটি জনপদে, প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে।
শহীদ জিয়া ছিলেন এমন এক রাষ্ট্রনায়ক, যিনি বলেছিলেন, ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ।’ এই উক্তি কোনো বক্তৃতার অলংকার ছিল না, ছিল তার জীবনের দর্শন। আজকের বাংলাদেশে যখন রাজনীতি আবারো একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, তখন তার এই দর্শন নতুন করে আলোচনায় ফিরে আসে। বিশেষ করে বিএনপির নির্বাচনমুখী রাজনৈতিক প্রচারণা এবং “সবার আগে বাংলাদেশ” শীর্ষক যে রাষ্ট্রচিন্তা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান সামনে নিয়ে এসেছেন, তা নিঃসন্দেহে শহীদ জিয়ার রাজনৈতিক দর্শনেরই ধারাবাহিকতা।
* স্বাধীনতার ঘোষণা ও এক অনন্য নেতৃত্ব
১৯৭১ সালের উত্তাল দিনগুলোতে বাংলাদেশের ইতিহাস যখন গভীর অনিশ্চয়তায়, তখন একজন সেনা কর্মকর্তা বিদ্রোহের সাহস দেখালেন। মেজর জিয়াউর রহমান। ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বর্বর আক্রমণের পর তিনি যে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, তা কেবল একটি ঘোষণা ছিল না, ছিল একটি জাতিকে জেগে ওঠার আহ্বান। যদি তিনি সেই মুহূর্তে বিদ্রোহ ঘোষণা না করতেন, যদি তিনি মাইক্রোফোনে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতার ডাক না দিতেন, তাহলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম হয়তো আরও দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী হতো।
তার সেই ঐতিহাসিক ঘোষণা আজো আমাদের জাতীয় চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। ‘উই রিভোল্ট’ শুধু একটি বাক্য নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের জন্মদলিল। সেই বিদ্রোহ থেকেই জন্ম নেয় আজকের বাংলাদেশ, যে বাংলাদেশ ৫৪ বছর পেরিয়ে একটি স্বতন্ত্র জাতি সত্তা নিয়ে বিশ্বের বুকে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেছে।
* শাহাদাত ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি
শহীদ জিয়ার সততা, দেশপ্রেম ও আপসহীন নেতৃত্ব তাকে অল্প সময়েই মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে দেয়। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সত্য ও জনপ্রিয়তা সবসময় ষড়যন্ত্রের লক্ষ্যবস্তু হয়। তার ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা দেশবিরোধী ও আধিপত্যবাদী শক্তির কাছে অসহনীয় হয়ে ওঠে। এরই পরিণতিতে ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
মাত্র ৪৬ বছর বয়সে এই মহান নেতার জীবনপ্রদীপ নিভে যায়। কিন্তু তার আদর্শ, তার রাষ্ট্রচিন্তা, তার স্বপ্ন আজো জীবিত। তার শাহাদাত কোনো ব্যক্তির মৃত্যু ছিল না, ছিল একটি জাতির জন্য গভীর ক্ষতি।
বহুদলীয় গণতন্ত্র ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ
শহীদ জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি মৌলিক পরিবর্তন নিয়ে আসেন। তিনি একদলীয় শাসনের বিপরীতে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। তার প্রবর্তিত বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ছিল এমন একটি দর্শন, যেখানে ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক পরিচয়ের সমন্বয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় সত্তা গড়ে তোলা হয়।
তিনি বুঝেছিলেন, এই দেশের শক্তি তার জনগণ। তাই ‘জনতার জিয়া’ হয়ে ওঠার মধ্য দিয়েই তিনি রাজনীতিকে ক্ষমতার খেলা থেকে জনগণের কল্যাণের পথে ফিরিয়ে আনেন।
* অর্থনীতি, কৃষি ও গ্রামমুখী উন্নয়ন
শহীদ জিয়ার রাষ্ট্রচিন্তার অন্যতম ভিত্তি ছিল গ্রাম। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, “বাংলাদেশ অর্থ গ্রাম।” তার অর্থনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে ছিল কৃষি ও উৎপাদন। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে তিনি যে খাল খনন কর্মসূচি গ্রহণ করেন, তা ছিল যুগান্তকারী।
১৯৭৬ সালে যশোরের উলশি-যদুনাথপুর খাল খনন প্রকল্পের মাধ্যমে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। পরবর্তীতে সারাদেশে ১৪ হাজার খাল খননের মাধ্যমে সেচব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটে এবং কৃষি উৎপাদনে বিপ্লব সাধিত হয়।
* শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মননের বিকাশ
শহীদ জিয়া কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়নেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তিনি জাতির মনন গঠনে শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। ১৯৭৮ সালে জাতীয় শিক্ষা উপদেষ্টা কমিটি গঠন, জাতীয় শিক্ষা ওয়ার্কশপ আয়োজন, থানা পাবলিক লাইব্রেরি স্থাপন প্রকল্প— সবকিছুই তার সুদূরপ্রসারী চিন্তার ফসল।
একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রবর্তনের মাধ্যমে তিনি সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির পথ সুগম করেন। বাংলা একাডেমির প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন তার আমলেই দৃশ্যমান হয়।
* শিশু, স্বাস্থ্য ও মানবিক রাষ্ট্রভাবনা
শিশুদের সৃজনশীল বিকাশে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, জাতীয় শিশুপার্ক, ‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিযোগিতা ছিল তার মানবিক রাষ্ট্রভাবনার প্রতিফলন। স্বাস্থ্যখাতে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, আইসিডিডিআরবি, নার্সিং কলেজসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান তার দূরদর্শিতার সাক্ষ্য বহন করে।
* পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব
পররাষ্ট্রনীতিতে শহীদ জিয়া বাংলাদেশকে ভিক্ষুকের জাতি থেকে আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রে রূপান্তর করেন। “সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়” নীতির বাস্তব প্রয়োগ তার হাতেই শুরু হয়। সার্ক প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন, ইরান-ইরাক যুদ্ধ নিরসনে ভূমিকা, মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার— সবই তার কূটনৈতিক প্রজ্ঞার নিদর্শন।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি মাইলামের মন্তব্য আজো প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছিলেন, জিয়া বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করেছিলেন।
* উত্তরাধিকার ও আগামী বাংলাদেশ
শহীদ জিয়ার শাহাদাতের পর বাংলাদেশ রাজনীতিতে পথ হারায়। কিন্তু ইতিহাস থেমে থাকে না। তার উত্তরাধিকার আজো বহমান। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সেই ধারাবাহিকতার প্রতিনিধিত্ব করছেন। তার রাজনৈতিক চিন্তা, রাষ্ট্রভাবনা ও “সবার আগে বাংলাদেশ” দর্শনে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয় শহীদ জিয়ার আদর্শ।
মা বেগম খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশপন্থী রাজনীতির এই ধারক যে আগামী দিনের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন, তা এখন আর কল্পনা নয়, বাস্তবতার দিকেই এগোচ্ছে।
*'উপসংহার
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ। ইতিহাস বলে, এমন মানুষ সময়ের তুলনায় বড় হন, কিন্তু সময় তাদের ধরে রাখতে পারে না। তার জীবন ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। আজ তার জন্মদিনে আমরা শুধু একজন নেতাকে স্মরণ করি না, আমরা স্মরণ করি একটি দর্শন, একটি স্বপ্ন, একটি আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশের রূপরেখা।
শহীদ জিয়া নেই, কিন্তু তার বাংলাদেশ আজো পথ খোঁজে তারই দেখানো আলোর
লেখক: সাহিত্যিক গবেষক উন্নয়নকর্মী ও সাংবাদিক।