আলী আজীম, মোংলা (বাগেরহাট) প্রতিনিধি:
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনাটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করেই তৈরি করেছে। পরিবেশ ও সমাজের প্রভাব পর্যাপ্তভাবে বিবেচনা করা হয়নি এবং জনগণের অংশগ্রহণকে উপেক্ষা করা হয়েছে বলে দাবি জানিয়েছে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিগণ। অন্তবর্তীকালীন সরকার ২৫ বছর মেয়াদি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা ( ইপিএসএমপি-২২৫ ) অনুমোদনের প্রাক্কালে মোংলায় এক প্রতিবাদ সমাবেশ, র্যালি ও অবস্থান কর্মসুচির মাধ্যমে এই প্রতিক্রিয়া জানানো হয়।
বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) সকাল ১১টায় মোংলার কানাইনগর পশুর নদের পাড়ে এই প্রতিবাদ সমাবেশ, র্যালি ও অবস্থান কর্মসূচির অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন কর্মজোট (বিডব্লিউজিইডি), মোংলা নাগরিক সমাজ, প্রতিবেশ ও উন্নয়ন ফোরাম-মোংলা এবং উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন) এর যৌথ আয়োজনে এইসব কর্মসূচি পালন করা হয়।
প্রতিবাদ সমাবেশ ও অবস্থান কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন মোংলা নাগরিক সমাজের সভাপতি মোঃ নূর আলম শেখ। এ সময় প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তৃতা করেন পরিবেশযোদ্ধা আব্দুর রশিদ হাওলাদার, সাংবাদিক নেতা হাছিব সরদার, মোংলা নাগরিক সমাজের কমলা সরকার, জেলে সমিতির নেতা শাহাদাত ব্যাপারী, জাহিদ হোসেন, প্রতিবেশ ও উন্নয়ন ফোরাম মোংলার মেহেদী হাসান প্রমূখ।
প্রতিবাদ সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে মোংলা নাগরিক সমাজের সভাপতি মোঃ নূর আলম শেখ বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের খসড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনাটি (২০২৬–২০৫০) প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় জনসাধারণ, নাগরিক সমাজ ও স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে, তাদের মতামত নেয়া হয়নি। কোনো ধরনের জনশুনানি বা উন্মুক্ত পরামর্শ ছাড়াই এই গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা পূর্ববর্তী স্বৈরাচারী সরকারের অস্বচ্ছ ও দায়মুক্তিমূলক নীতি প্রণয়নেরই পুনরাবৃত্তি।
তিনি আরো বলেন অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব ছিল কেবল নিয়মিত রাষ্ট্র পরিচালনা নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই সীমা অতিক্রম করে একটি দীর্ঘমেয়াদি, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ও বহুমাত্রিক প্রভাবসম্পন্ন জ্বালানি পরিকল্পনা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এমনকি উচ্চ আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও কোনো অর্থবহ অংশগ্রহণমূলক পরামর্শ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। যেভাবে অতীতে দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন ব্যবহার করে বিতর্কিত প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, এনার্জি ও পাওয়ার সিস্টেম মাস্টারপ্লান ইপিএসএমপি ২০২৫ সেই একই পথে জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভর প্রকল্পকে বৈধতা দেওয়ার কাঠামো তৈরি করছে।
প্রতিবাদ সমাবেশে মোংলা নাগরিক সমাজের সহসাধারণ সম্পাদক নারীনেত্রী কমলা সরকার বলেন, মহাপরিকল্পনায় "এনার্জি ট্রানজিশন"-কে ব্যাপক প্রচার করা হলেও বাস্তবে প্রকৃত নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ সেখানে মাত্র ১৭%, যেখানে কাগজে দেখানো হয়েছে ৪৪%। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ১৫.৮ গিগাওয়াট থেকে বাড়িয়ে ২৫.২ গিগাওয়াট করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ২৫ বছর পরও এলএনজি, কয়লা ও তেলের ওপর নির্ভরতা ৫০% থাকবে- যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ঝুঁকি। যা হচ্ছে বাস্তবসম্মত নয় এবং ভবিষ্যতে দেশকে নতুন ঋণ, ভর্তুকি ও পরিবেশগত সংকটে ফেলবে। এই পরিকল্পনা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষিত 'শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব, শূন্য কার্বন' দর্শনের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে বিরোধী। পাশাপাশি শ্রমিক পুনর্বাসন, নারী ও লিঙ্গভিত্তিক ন্যায্যতা, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং পোশাক খাতের সবুজায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পরিকল্পনায় প্রায় উপেক্ষিত রাখা হয়েছে।
প্রতিবাদ কর্মসূচি থেকে জোরালো দাবি জানিয়ে বলা হয় (১) অবিলম্বে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা ২০২৫ (ইপিএসএমপি ২০২৫) স্থগিত এবং সম্পূর্ণ বাতিল করতে হবে। (২) নাগরিক সমাজ, বিশেষজ্ঞ এবং সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণে স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় পরামর্শ প্রক্রিয়া অবিলম্বে শুরু করতে হবে। (৩) জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা দ্রুত কমিয়ে, বাস্তবসম্মত ১০০% নবায়নযোগ্য জ্বালানির রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে। (৪) ন্যায্য, সামাজিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি রূপান্তরের ভিত্তিতে নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তারা বলেন, অবিলম্বে দাবি মানা না হলে অন্যথায়, খসড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা ২০২৫ বাংলাদেশের ইতিহাসে পরিণত হবে আরেকটি জনবিরোধী, অস্বচ্ছ এবং দায়মুক্তিমূলক নথি, যা দেশের জনগণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। প্রতিবাদ সমাবেশ ও অবস্থান কর্সুচিতে জীবাশ্ম জ্বালানি বিরোধী নানা পোস্টার প্লাকার্ড প্রদর্শন করা হয়। সবশেষে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের অংশগ্রহণে র্যালি অনুষ্ঠতি হয়।
একে