মুহঃ জিল্লুার রহমান, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি:
কোন প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে সাতক্ষীরার চারটি সংসদীয় আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং ‘জুলাই গণ-সনদ’ সংস্কারের ওপর গণভোটের ভোট গ্রহণ শেষ হয়েছে।
বৃহষ্পতিবার (১২ ফেব্রæয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হয়ে বিরতিহীনভাবে ভোট গ্রহণ চলে বেলা সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। ভোট গ্রহণ শেষে এখন চলছে গণনা। জেলা পুলিশ সুপারের তথ্য অনুয়ায়ি জেলার চারটি আসনে ৭২ দশমিক ৭৩ শতাংশ ভোট পড়েছে।
বৃহস্পতিবার সাতক্ষীরার চারটি সংসদীয় আসনের বিভিন্ন ভোট কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে সকাল থেকে দীর্ঘ লাইনে দাড়িয়ে ভোটাররা ভোট দিচ্ছেন। শুরুতেই কেন্দ্রে ভোটারের উপস্থিতি কম থাকলেও বেলা বাড়ার সাথে সাথে প্রতিটি কেন্দ্রে ভোটারের দীর্ঘ লাইন পড়ে যায়। সকালের দিকে প্রায় প্রতিটি কেন্দ্রে নারী ভোটারের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মত। জেলার প্রতিটি কেন্দ্রে নারী-পুরুষ পৃথক লাইনে দাড়িয়ে ভোট দিয়েছেন। দীঘদিন পর নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারায় ভোটারদের মধ্যে একরকম উৎসবের আমেজ বিরাজ করে। ভোট দিতে এসে কাউকে ফিরে যেতে দেখা যায়নি। তবে দুপুরের পর প্রায় প্রতিটি কেন্দ্রে ভোটারের উপস্থিত কমে যায়। এসময় অনেক কেন্দ্রে দায়িত্বরত ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের অলস সময় কাটাতে দেখা গেছে।
শ্যামনগরের বংশীপুর প্রাইমারী স্কুল কেন্দ্রে ভোট দিতে আসা বৃদ্ধ হযরত আলী জানান, অনেকদিন পর শান্তিপূর্নভাবে নিজের ভোট দিতে পেরেছি। এর আগে ২/৩টা ভোটে কেন্দ্রে এসে জানতে পারি আমার ভোট আগেই দেওয়া হয়ে গেছে। এছাড়া নির্দিষ্ঠ প্রাথীকে ভোট দেওয়ার জন্য চাপও ছিল। কিন্তু এবার কোন রকমর প্রেশানি ছাড়াই নিজের ভোট নিজের মত করে দিতে পারলাম। ভোট দিতে পেরে খুব ভাল লাগছে।
কালিগঞ্জের নবীননগর গ্রামের জাহানারা খাতুন বলেন, সবার আগে ভোট দেওয়ার জন্য কেন্দ্রে এসে দেখি অনেক মানুষের লাইন। এরপরও লাইনে দাড়িয়ে ভোট দিয়েছি। কোন রকম বিরক্তিবোধ হয়নি। ২০০৮ সালের পরে আর কোন ভোট দিতে পারিনি। অনেকদিন পর এবার ভোট দিতে পেরে ভাল লাগছে।
আশাশুনির বিছট নিউ মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কেন্দ্রে ভোট দিতে আসা তরুণ ভোটার এম. মিরাজ মাশরাফি জানান, এবারই প্রথম ভোটার হয়েছি, তাই জীবনের প্রথম ভোট দিব আজ। তরুণদের কাঙ্খিত একটি সুন্দর দেশ গঠনে সৎ ও যোগ্য প্রার্থীকেই আমার জীবনের প্রথম ভোট দিব বলে জানান তিনি।
সদর উপজেলার ধুলিহর এলাকার ইউনুচ আলী জানান, গত ২০০৮ সালের পর আর কোন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে পারেনি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ পর্যন্ত হবে কিনা তা নিয়েও সাধারণ মানুষের মনে নানা ধরনের সংশয় ছিল। অবশেষে সকল জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে কাঙ্খিত ভোট দানের দিন এসেছে। অনেক দিনে পর নির্বিঘেœ ভোট দেওয়ার সুযোগ পাওয়ায় ভাল লাগছে।
জেলা নির্বাচন অফিস সূত্র জানায়, সাতক্ষীরার চারটি সংসদীয় আসনে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ মোট ১৯ জন প্রতিদ্ব›িদ্বতা করছেন। এর মধ্যে সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) আসনে ৫ জন, সাতক্ষীরা-২(সদর-দেবহাটা) আসনে ৬ জন, সাতক্ষীরা-৩ (আশাশুনি-কালিগঞ্জ) আসনে ৪ জন এবং সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর) আসনে ৪ জন ।
জেলার চারটি সংসদীয় আসনে ৬০৯ টি কেন্দ্রের ৩৪১০টি বুথে মোট ১৮ লাখ ৩২ হাজার ৭৭৫ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার রয়েছে ৯ লাখ ১৭ হাজার ৮৪৮ জন এবং নারী ভোটার রয়েছে ৯ লাখ ১৪ হাজার ৯১৪ জন। এছাড়া হিজড়া ভোটার রয়েছে ১৩জন।
সাতক্ষীরা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আরেফিন জুয়েল জানান, নির্বাচনে ভোটারের উপস্থিত ছিল মোটামুটি সন্তোষজনক। জেলার চারটি সংসদীয় আসনে ৭২ দশমিক ৭৩ শতাংশ ভোট পড়েছে। এর মধ্যে কলারোয়া উপজেলায় সার্বাধিক ভোট পড়েছে ৮১ দশমিক ৮৯ শতাংশ।
জেলা রির্টানিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মিজ্ আফরোজা আখতার বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে জেলা কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। কোথাও কোন প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই শান্তিপূর্নভাবে ভোট গ্রহণ শেষ হয়েছে। এখন চলছে ভোট গণনা।
প্রসঙ্গত, দীর্ঘদিন পর একটি মুক্ত ও নিরপেক্ষ পরিবেশে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা দেখা যায়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর এক ভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশে প্রথমবারের মতো একই দিনে ব্যালটের মাধ্যমে সংসদ সদস্য নির্বাচন ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের পক্ষে-বিপক্ষে রায় দিলেন ভোটাররা। এখন ফলাফল পেতে অপেক্ষা করতে হবে ভোট গণনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত।
এমআই