পবিপ্রবি প্রতিনিধি:
চব্বিশের ৫ আগস্ট অভ্যুত্থান–পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসন নতুন করে সাজায়, যা নিয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে ‘জামায়াতিকরণ’-এর অভিযোগ ওঠে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) উপ-উপাচার্য পদে নিয়োগ পান প্রফেসর ড. এস. এম. হেমায়েত জাহান।
পটুয়াখালী জেলা জামায়াতে ইসলামীর সুপারিশে তিনি নিয়োগপ্রাপ্ত হন বলে পটুয়াখালী জেলা জামায়াত ও পবিপ্রবির জামায়াতপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন গ্রীন ফোরামের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
পবিপ্রবির একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. এস. এম. হেমায়েত জাহান পটুয়াখালী ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান, পটুয়াখালী পৌরসভার জামায়াতের মেয়র প্রার্থী এবং শিবিরের প্রভাবশালী কেন্দ্রীয় নেতা আবদুল্লাহ আল নাহিয়ানের খুবই ঘনিষ্ঠ। প্রফেসর হেমায়েত জাহান পটুয়াখালী ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামীর বিভিন্ন কর্মসূচিতে অর্থায়ন করে থাকেন।
বর্তমানে বিএনপি পন্থী শিক্ষকদের সংগঠন ইউট্যাবের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও ২০২৫ সালে ছাত্র শিবিরের প্রোগ্রামে অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপি পন্থী কিছু শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সাথে মনোমালিন্যেও জড়িয়ে পড়েছিলেন এ শিক্ষক।
আরও জানা যায়, প্রফেসর হেমায়েত জাহান ২০০৬–০৭ সালে পবিপ্রবির জামায়াতপন্থী ভিসি প্রফেসর ড. আবদুল লতিফ মাছুমের একান্ত সচিব ছিলেন। সে সময় পবিপ্রবিতে ছাত্রশিবিরপন্থী বহু শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগ পান। অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রফেসর হেমায়েত জাহানের বাবা মাওলানা মো. শাজাহান ১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে পটুয়াখালী–১ আসনে বিএনপি প্রার্থী সাবেক মন্ত্রী এম. কেরামত আলীর বিরুদ্ধে নির্বাচন করেছিলেন।
চব্বিশের ৫ আগস্টের পর সাময়িকভাবে রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রফেসর হেমায়েত জাহান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা, সহকারী প্রক্টর, পরিচালক (গবেষণা ও ট্রেনিং) এবং পরিচালক (আইকিউএসসি)–এর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের বঞ্চিত করে জামায়াতপন্থী শিক্ষকদের পদায়ন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের মধ্যে এখনো চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।পবিপ্রবিতে জামায়াত ও শিবিরের অবস্থান সুদৃঢ় হওয়ার পেছনে প্রফেসর হেমায়েত জাহানের ভূমিকা অগ্রগণ্য বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, প্রফেসর হেমায়েত জাহান জগন্নাথ কলেজের প্রাণিবিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ডিগ্রি না থাকা এবং পবিপ্রবিতে তাঁর কোনো বিভাগ না থাকলেও তিনি সেখানে শিক্ষকতার চাকরি বাগিয়ে নেন—এ নিয়ে সে সময় জাতীয় পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশসহ ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিলেন এ শিক্ষক।
সরেজমিনে জানা গেছে, সম্প্রতি প্রফেসর হেমায়েত জাহান বিএনপির ব্যানারে উপাচার্য হওয়ার লক্ষ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজনদের কাছে দৌড়ঝাঁপ করছেন।
পবিপ্রবির উপাচার্য প্রফেসর ড. কাজী রফিকুল ইসলাম ও উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. এস. এম. হেমায়েত জাহানের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৫৩ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার ও কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন খাতসহ বিভিন্ন সেক্টর থেকে অর্থ লোপাটের অভিযোগও রয়েছে। উপাচার্য ড. কাজী রফিকুল ইসলামের এসব কর্মকাণ্ডে উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. হেমায়েত জাহান ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে উপাচার্যের চেয়ার দখলের লক্ষ্যে প্রফেসর হেমায়েত জাহান শক্তভাবে মাঠে নেমেছেন। একটি গোপনীয় সূত্রের দাবি, প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ একজন উপদেষ্টার সহকারী একান্ত সচিবের মাধ্যমে ওই উপদেষ্টাকে ‘ম্যানেজ’ করে উপাচার্য নিয়োগ পেতে জোরালো তদবির চালানো হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের লেনদেনের গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছে।
পবিপ্রবি সূত্রে আরও জানা যায়, উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. এস. এম. হেমায়েত জাহানের নেতৃত্বে প্রফেসর ড. আতিকুর রহমান ও প্রফেসর ড. জামাল হোসেনকে নিয়ে গঠিত ‘হেমায়েত–আতিক–জামাল’ প্যানেল বর্তমানে সক্রিয়। অভিযোগ রয়েছে, এই প্যানেল ক্যাম্পাসে ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করছে, যাতে নতুন সরকার প্রশাসন পুনর্গঠন করলে তাঁদের বাইরে অন্য কেউ উপাচার্য, উপ-উপাচার্য বা ট্রেজারারের পদে বসার সাহস না পান।
একে