মো: রাব্বি হাসান, ববি:
তীব্র পরিবহন ও জনবল সংকটে বিপর্যস্ত বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি)। প্রায় ১০ হাজার শিক্ষক-শিক্ষার্থীর বিপরীতে রয়েছে মাত্র ২৫টি যানবাহন, অথচ চালক আছেন মাত্র ১১ জন। জনবল সংকট এতটাই প্রকট যে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে হেল্পার এমনকি নিরাপত্তাকর্মী দিয়েও বাস পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে। সীমিত বাসসেবা, প্রয়োজনীয় লোকবলের ঘাটতি এবং নড়বড়ে ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনের কারণে প্রতিদিনই চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
নতুনবাজার রুটে ২৮ আসনের মিনিবাসে ৪৫ থেকে ৫০ জন শিক্ষার্থীর ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াত এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থীকে বাসের দরজার বাইরে ঝুলে বা এক পায়ের ওপর ভর দিয়ে চলাচল করতে দেখা যায়। পরিস্থিতি যেন দড়ির ওপর হাঁটার মতো অনিশ্চিত এক যাত্রা। কয়েকদিন আগেই এমন ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াতের সময় পড়ে গিয়ে এক শিক্ষার্থীর হাত ভেঙে যায়।
বাসে জায়গা না পেয়ে অনেক শিক্ষার্থী অতিরিক্ত খরচে ইজিবাইক ও রিকশায় দূরপথ পাড়ি দিচ্ছেন। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে।
সম্প্রতি দুর্ঘটনার শিকার অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের ২০২৩–২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. মারুফ হোসেন বলেন,
“ক্লাস শেষে বাসে জায়গা না পেয়ে বাধ্য হয়ে ইজিবাইকে উঠেছিলাম। ব্রিজ থেকে নামার সময় গাড়িটি দুর্ঘটনার শিকার হয়। এতে আমার বাঁ হাত ও বাঁ পা ভেঙে যায় এবং গুরুতর আহত হই। প্রায় দুই মাস বিছানায় থাকতে হয়েছে। চিকিৎসায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি আমার সেমিস্টার পরীক্ষাও খারাপ হয়েছে।”
নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “১৪ বছর পার হওয়ার পরও কেন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন পরিবহন সংকট থাকবে? কেন প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হবে? আমরা এখানে পড়াশোনা করতে এসেছি, একটি সুন্দর ও নিরাপদ পরিবেশে নিজেদের গড়ে তুলতে। কিন্তু যদি প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার শঙ্কায় থাকতে হয়, তাহলে আমাদের নিরাপত্তা কোথায়?”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ২০২২–২৩ শিক্ষাবর্ষের দর্শন বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, “নতুনবাজার রুটের বাস সেবার বর্তমান পরিস্থিতি শিক্ষার্থীদের জন্য চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বাস সংকটের কারণে প্রতিটি বাসে ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ শিক্ষার্থী যাতায়াত করতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেক শিক্ষার্থী দরজার সঙ্গে ঝুলে বা এক পায়ের ওপর ভর দিয়ে যাতায়াত করছেন, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।”
এই শিক্ষার্থী আরও বলেন, “এই রুটের বাস প্রায়ই বিকল হয়ে পড়ায় শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট স্টপেজে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। ফলে ক্লাস, পরীক্ষা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানাচ্ছি—নতুনবাজার রুটে পর্যাপ্ত ও নিরাপদ বাস সরবরাহ এবং বাসের ফিটনেস নিশ্চিত করে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ দ্রুত নিরসন করা হোক।”
পরিবহন পুল সূত্রে জানা গেছে, নতুনবাজার রুটের একটি বাস বর্তমানে মেরামতের জন্য পাঠানো হয়েছে, যা সচল হতে আরও কয়েকদিন সময় লাগতে পারে।
সূত্রটি আরও জানায়, ইউজিসির নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী এ সময়ের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের বহরে মোট ৩৫টি যানবাহন যুক্ত হওয়ার কথা ছিল। তবে বর্তমানে বাস, মাইক্রোবাস, জিপ, অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরসাইকেল মিলিয়ে যানবাহনের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫টিতে। এর মধ্যে বাস রয়েছে মাত্র ১৩টি। উল্লেখ্য, ২০২১–২২ অর্থবছরের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নতুন কোনো বাস সংযোজন করা হয়নি।
ফলে বাস বন্ধ থাকলে শিক্ষার্থীদের অটো, ইজিবাইক বা পিকআপে করে শহরে যাতায়াত করতে হয়। এসব যানবাহনে অতিরিক্ত যাত্রী বহন ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণে বাড়ছে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম বলেন, “আমাদের একটি মিনিবাস রমজানের ছুটির মধ্যে রিপেয়ার করা হবে। গাড়ি কেনার জন্য বরাদ্দ থাকলেও অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে এ বছর নতুন গাড়ি কেনা যাবে না বলা হয়েছে। তবে আমরা চিঠি দিয়েছি, যাতে গাড়ি কেনার বরাদ্দের অর্থ দিয়ে ভাড়া গাড়ি নেওয়ার অনুমতি পাওয়া যায়।”
তিনি আরও বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরু থেকে যে বিআরটিসি বাসগুলো চালানো হচ্ছে, সেগুলোর একটারও ছারপত্র বা অনাপত্তিপত্র নেই। ইউজিসি চাইলে যেকোনো সময় অর্থ বরাদ্দ বন্ধ করে দিতে পারে। তবে আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনটি গাড়ি ভাড়া নিয়েছি এবং সেগুলোর অনাপত্তিপত্র নিজ হাতে সংগ্রহ করেছি।”
জনবল নিয়োগ প্রসঙ্গে উপাচার্য বলেন, “আমাদের ১৬টি পদের অনুমোদন রয়েছে। চাইলে নিয়োগ দিতে পারি, কিন্তু বিভিন্ন জনের আপত্তির কারণে তা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।”
এমআই