লামিয়া আর্জুমান্দ:
একসময় বাংলাদেশে মৃত্যুর প্রধান কারণ ছিল কলেরা, যক্ষ্মা কিংবা অন্যান্য সংক্রামক ব্যাধি। চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন, টিকাদান কর্মসূচির বিস্তার এবং জনস্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে এসব রোগ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। কিন্তু সেই শূন্যস্থান ধীরে ধীরে দখল করে নিয়েছে আরেকটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি অ-সংক্রামক রোগ বা নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ (এনসিডি)।
হৃদরোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার এবং দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ এখন দেশের মানুষের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এগুলো হঠাৎ করে আক্রমণ করে না; বরং বছরের পর বছর ধরে শরীরের ভেতরে নীরবে বাসা বাঁধে এবং একসময় মারাত্মক রূপ নিয়ে জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বজুড়েই এখন অ-সংক্রামক রোগ মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক মোট মৃত্যুর বড় একটি অংশই এখন এসব রোগের কারণে ঘটে। উন্নত দেশগুলোর পাশাপাশি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতেও এর প্রকোপ দ্রুত বাড়ছে, আর বাংলাদেশও সেই বাস্তবতার বাইরে নয়।
লক্ষণহীন শুরু, ভয়াবহ পরিণতি
অ-সংক্রামক রোগের অন্যতম বিপজ্জনক দিক হলো, এগুলোর শুরুতে তেমন কোনো লক্ষণ থাকে না। অনেক সময় উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস বছরের পর বছর ধরে শরীরে থাকে, অথচ আক্রান্ত ব্যক্তি তা বুঝতেই পারেন না। যখন উপসর্গ স্পষ্ট হয়, তখন অনেক ক্ষেত্রে রোগ জটিল পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার প্রবণতা কম থাকায় অনেকেই দেরিতে রোগ শনাক্ত করেন। ফলে চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে এবং মৃত্যুঝুঁকিও বেড়ে যায়।
জীবনযাত্রার পরিবর্তনে বাড়ছে ঝুঁকি
বাংলাদেশে অ-সংক্রামক রোগ বৃদ্ধির পেছনে জীবনযাত্রার পরিবর্তন একটি বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দ্রুত নগরায়ন, প্রযুক্তিনির্ভর জীবন এবং অফিসকেন্দ্রিক কর্মব্যবস্থার কারণে মানুষের শারীরিক পরিশ্রম আগের তুলনায় কমে গেছে।
একসময় মানুষ হেঁটে বাজারে যেতেন বা দৈনন্দিন কাজেই পর্যাপ্ত শারীরিক শ্রম করতেন। এখন মোটরযান, লিফট ও বিভিন্ন ডিজিটাল যন্ত্রপাতি সেই পরিশ্রমের জায়গা দখল করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ফাস্টফুড ও অতিরিক্ত লবণ-চিনি সমৃদ্ধ প্রক্রিয়াজাত খাবারের ব্যবহার।চিকিৎসকদের মতে, এসব পরিবর্তনের কারণে শিশু-কিশোরদের মধ্যেও স্থূলতা এবং প্রি-ডায়াবেটিসের প্রবণতা বাড়ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য বড় সতর্কবার্তা।
তামাক ও দূষণও বড় ঝুঁকি
তামাক ব্যবহার এখনও বাংলাদেশের বড় একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা। ধূমপান ও তামাকজাত পণ্য ফুসফুসের রোগ ছাড়াও হৃদরোগ এবং বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।
এছাড়া নগর এলাকায় বায়ুদূষণও দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগের অন্যতম কারণ হয়ে উঠছে। দূষিত বাতাসের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফুসফুসের ওপর গুরুতর ক্ষতি ডেকে আনছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অর্থনীতি ও সমাজেও প্রভাব
অ-সংক্রামক রোগ শুধু স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়, এটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটও তৈরি করে। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকলে পুরো পরিবার আর্থিক চাপে পড়ে।
চিকিৎসা ব্যয়, ওষুধের খরচ এবং কর্মক্ষমতা হ্রাস। সব মিলিয়ে অনেক পরিবার দারিদ্র্যের চক্রে পড়ে যায়। জাতীয় পর্যায়েও এর প্রভাব সুস্পষ্ট। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অসুস্থতা উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয় এবং স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।
প্রতিরোধই বড় সমাধান
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অ-সংক্রামক রোগের বড় অংশই প্রতিরোধযোগ্য। নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম, সুষম খাদ্যাভ্যাস, তামাক বর্জন এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ঝুঁকি অনেকটাই কমাতে পারে।
সরকারি পর্যায়েও এ বিষয়ে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের বিভিন্ন কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এনসিডি কর্নার চালুর মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত ও ব্যবস্থাপনার চেষ্টা চলছে।
এর পাশাপাশি গণমাধ্যমে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, বিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যশিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা এবং জনসাধারণের মধ্যে স্বাস্থ্যকর জীবনধারার প্রচার দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক ফল দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন
বিশেষজ্ঞদের মতে, অ-সংক্রামক রোগকে শুধু চিকিৎসার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একটি বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জ, যার মোকাবিলায় ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র সব স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। সেই অগ্রযাত্রাকে টেকসই করতে হলে জনস্বাস্থ্যের এই নীরব সংকটকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ সুস্থ মানুষই পারে একটি সুস্থ সমাজ ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গড়ে তুলতে। অ-সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে সচেতনতা, প্রতিরোধ এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের অন্যতম বড় দাবি।
নাম: লামিয়া আর্জুমান্দ।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ,
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।