অনলাইন ডেস্ক:
ময়মনসিংহ থেকে ঢাকাগামী ইউনাইটেড পরিবহনের যাত্রী ছিলেন ধানমন্ডির বাসিন্দা আনসার উদ্দিন। রোববার দুপুর ২টায় তাঁর গাড়ি স্টেশন ত্যাগ করে। পথে ময়মনসিংহ বাইপাস পার হয়ে এশিয়া পেট্রোল পাম্পে তেল নিতে থামে। কিন্তু পাম্পে তেল বিক্রি বন্ধ ছিল।
পরে ভালুকার একটি পেট্রোল পাম্পে প্রবেশ করতে চাইলেও গাড়ির দীর্ঘ লাইনের কারণে সেখানেও ব্যর্থ হয় বাসটি। শেষে গাজীপুর এলাকায় আরেকটি পাম্পে তেল কিনতে চাইলে পাম্পের কর্মীরা জানান, তাদের মজুত শেষ। শেষ পর্যন্ত বাসচালক সিদ্ধান্ত নেন, কোথাও না থামিয়ে সরাসরি মহাখালী পৌঁছাবেন, যাতে মাঝে কোথাও তেল সংকটে গাড়িটি থেমে না যায়। কয়েক দিন ধরে এভাবেই জ্বালানি তেলের সংকটে ভুগছেন গাড়িচালকরা। তিন-চারটি পাম্প ঘুরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে নিজেদের গাড়ি বা মোটরসাইকেলের জন্য জ্বালানি সংগ্রহ করছেন চালকরা। যদিও সরকার বলছে, জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তেল সংগ্রহে দেশজুড়ে মানুষকে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
তেল না থাকায় দেশের অনেক এলাকায় পাম্প বন্ধ রাখছেন মালিকরা। সরকার বাধ্য হয়ে রেশনিং শুরু করেছে। কিন্তু এতে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। স্টেশনগুলোতে ক্রেতার সঙ্গে কর্মচারীদের মারামারির ঘটনা ঘটছে। এরই মধ্যে একজন নিহত হয়েছেন। পণ্য পরিবহনকারী গাড়িগুলো চাহিদা অনুসারে তেল পাচ্ছে না।
পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কিছু পাম্প মালিক ও ডিলার জ্বালানি তেল মজুত করা শুরু করেছেন। এটি ঠেকাতে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে দেশের প্রধান প্রধান তেল ডিপোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। পাশাপাশি ফিলিং স্টেশনগুলোতে পুলিশি টহল জোরদার এবং অবৈধ মজুত ও অতিরিক্ত দামে বিক্রি ঠেকাতে মাঠ পর্যায়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে অতিরিক্ত তেল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে জ্বালানি সচিব মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, এপ্রিলের জন্য প্রায় তিন লাখ টন ডিজেল আমদানির চেষ্টা চলছে। কোন দেশ থেকে আমদানি করা হবে– জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা সব দিকের সোর্স থেকেই তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছি। যেখান থেকে পাওয়া যাবে, সেখান থেকেই কেনা হবে। প্রয়োজনে ডিপিএম (ডাইরেক্ট প্রকিউরমেন্ট মেথড) ফলো করে তেল সংগ্রহ করব।
রোববারও রাজধানীতে গাড়ির দীর্ঘ লাইন
শুক্র ও শনিবার ডিপো বন্ধ থাকায় পাম্পগুলোতে তেলের সংকট দেখা দিয়েছিল। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, রোববার তেল সরবরাহ শুরু হলেই পরিস্থিতির উন্নতি হবে। কিন্তু আসলে তা ঘটেনি। গতকালও পাম্পগুলো ঘিরে ছিল জ্বালানি তেলের হাহাকার। অনেক পাম্প তেল বিক্রি বন্ধ রেখেছিল। যেসব পাম্প খোলা ছিল, সেগুলোতে অপেক্ষমাণ গাড়ির লাইন দীর্ঘ হতে হতে এক থেকে দেড় কিলোমিটার লম্বা হয়েছে।
তেজগাঁওয়ের ফিলিং স্টেশনে গতকাল দুপুরে কথা হয় মোটরসাইকেলের চালক ইকবাল হোসেনের সঙ্গে। তিনি ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালান। বলেন, সকালে বাইক নিয়ে শুধু একটা রাইড শেষ করেছেন। এরপর প্রায় দুই ঘণ্টা চারটি পাম্প ঘুরে দুই লিটার অকটেন কিনতে পেরেছেন। দৈনিক বাংলা মোড়ে পেট্রোল পাম্পে গিয়ে দেখা যায়, তারা মোটরসাইকেলের তেল দিচ্ছেন না। তবে কয়েকটি গাড়িতে পেট্রোল বিক্রি করছেন। এ বিষয়ে পাম্প কর্তৃপক্ষ জানায়, ডিপো থেকে তেল এলে পুরোপুরি বিক্রি শুরু হবে। মতিঝিলের কারিম অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশনও গতকাল দুপুর বন্ধ পাওয়া গেছে।
ডিপোতে সেনা মোতায়েনের প্রস্তাব, ফিলিং স্টেশনে মোবাইল কোর্ট জোরদার
বিপিসির চেয়ারম্যানের চিঠিতে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে ডিলাররা বাড়তি চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল না পাওয়ায় চট্টগ্রামের পতেঙ্গা, খুলনার দৌলতপুর, সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ী, নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ও ফতুল্লা, দিনাজপুরের পার্বতীপুর এবং বরিশালের ডিপোগুলোতে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। এসব স্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হওয়ায় নিরাপত্তা জোরদার জরুরি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত, বেশি দামে বিক্রি ও পাচার ঠেকাতে জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার নির্দেশ দিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে চিঠি পাঠিয়েছে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ। রাজধানীর তেজগাঁও ও মহাখালী এলাকার কয়েকটি ফিলিং স্টেশনে অভিযানে কিছু পাম্পে তেল বিক্রি স্বাভাবিক থাকলেও কয়েকটিতে জ্বালানি শেষ হয়ে সাময়িকভাবে সরবরাহ বন্ধ পাওয়া গেছে।
দেশজুড়ে ভোগান্তি
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে দেশে জ্বালানি তেলের সম্ভাব্য সংকটের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পেট্রোল পাম্পে উপচে পড়া ভিড় দেখা যাচ্ছে। অনেক স্থানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে সীমিত পরিমাণে তেল নিতে হচ্ছে চালকদের। কোথাও আবার জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ায় পাম্প সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার ঘটনাও ঘটছে।
রোববার বিকেলে চট্টগ্রাম নগরীর গনি বেকারি এলাকার কিউসি পেট্রোল পাম্পে দেখা যায়, জামালখান-গনি বেকারি এবং গনি বেকারি-রহমতগঞ্জ সড়কজুড়ে আধাকিলোমিটারজুড়ে প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি। পাম্পের প্রবেশমুখে নিরাপত্তাকর্মীরা একটি গাড়ি বের হলে আরেকটি গাড়িকে ঢুকতে দিচ্ছিলেন। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মোটরসাইকেলের চালক রহমান মোরশেদ বলেন, যাত্রী পরিবহন করেই তাঁর সংসার চলে। আধাঘণ্টার বেশি সময় ধরে লাইনে থাকলেও কখন তেল পাবেন, তা নিশ্চিত নন। নগরীর বেশির ভাগ পাম্পে একই চিত্র দেখা গেছে। ওয়াসা মোড়ের খান ফিলিং স্টেশন ও টাইগারপাস এলাকার ফোর স্টার ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইনের কারণে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। অপেক্ষার সময় বেশি হওয়ায় চালকদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনাও ঘটেছে। কয়েকটি স্থানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মোতায়েন করতে হয়েছে।
একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গেছে দেশের অন্যান্য জেলাতেও। শেরপুরে কয়েকটি পাম্প ঘুরে এক ঘণ্টার বেশি লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিতে হচ্ছে চালকদের। সিলেটে অনেক পাম্পে জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ায় বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে। নগরীর মিরাবাজার বিরতি ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, তেল বিক্রি বন্ধ। পাম্পের স্বত্বাধিকার আখতার আহমদ লিটন বলেন, সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার ডিপো থেকে তেল এসেছে। গত শুক্রবার থেকে রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় কোনো সংস্থা তেল সরবরাহ করেনি। ফলে তাদের কাছে যা তেল ছিল, সব ফুরিয়ে গেছে।
খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে পেট্রোল ও অকটেনের সংকটে এক পাম্প থেকে অন্য পাম্পে ছুটছেন চালকরা। রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় আবার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে পেট্রোল বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। বগুড়ার কয়েকটি পাম্পের বিরুদ্ধেও বেশি দাম নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। যদিও সংশ্লিষ্ট পাম্প মালিকরা তা অস্বীকার করেছেন।
যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত রেশনিং
দেশে জ্বালানি তেলের মজুত বাড়তে শুরু করেছে জানিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি শেষ না হওয়া পর্যন্ত জ্বালানি তেল রেশনিং করে ব্যবহার করতে হবে। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
মন্ত্রী জানান, যুদ্ধ কতদিন চলবে, তা কেউ জানে না। তাই মজুত সাশ্রয় করতে সরকার রেশনিং পদ্ধতি চালু করেছে।
রেশনিংয়ে বেশি দুর্ভোগ
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রথমে পাম্পের কেনাকাটায় রেশনিংয়ের ঘোষণা দেয় সরকার। আর গতকাল ডিপো থেকে পাম্পগুলোকে বরাদ্দে ২৫ শতাংশ কম তেল দেওয়া হচ্ছে। রেশনিংয়ের এমন ঘোষণায় আতঙ্ক বেশি ছড়ায়।
বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির (একাংশ) সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, শুক্র ও শনিবার সরকারি ছুটির দিন হওয়ায় সাধারণত তেলবাহী গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকে। এ সময় পাম্পে তেল সরবরাহ করা হয় না। সেই চাপ এসে পড়েছে রোববারও। এ ছাড়া ডিপোগুলো থেকে তেল কম দেওয়া হচ্ছে। যেখানে দরকার চার গাড়ি, দিচ্ছে এক গাড়ি তেল। ফলে সময়ের অনেক আগেই পাম্পে তেল ফুরিয়ে যাচ্ছে। এই রেশনিংয়ের ভোগান্তি পোহাচ্ছি আমরা। তেল দিতে না পারায় গ্রাহকদের সঙ্গে ঝামেলা হচ্ছে।
ভারত থেকে অতিরিক্ত ডিজেল আমদানি
আসামের নুমালীগড় রিফাইনারি থেকে পাইপলাইনে ডিজেল আমদানি করে বাংলাদেশ। চুক্তি অনুসারে ২০২৬ সালে মোট পরিমাণ এক লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল আমদানি করতে পারবে বাংলাদেশ। এখন ভারত থেকে মাসে মাত্র পাঁচ হাজার টন কিনছে বিপিসি। এই পরিমাণ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। চলমান সংকটে নুমালীগড় থেকে ৫০ হাজার টন ডিজেল আনার কথা ভাবছে সরকার। ইতোমধ্যে ভারতীয় দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
পণ্য পরিবহনে সংকট
চলমান জ্বালানি তেলের সংকট পণ্য পরিবহনেও প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ঢাকায় পণ্য আনতে ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানগুলো চাহিদা অনুসারে ডিজেল পাচ্ছে না। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা এবং গাজীপুরে এই সমস্যা হয়েছে। জানতে চাইলে বাংলাদেশ ট্রাক কার্ভাডভ্যান মালিক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক হাসানুল কবির সমকালকে বলেন, পণ্য পরিবহনে জ্বালানি সংকট শনিবার পর্যন্ত তেমন অনুভূত হয়নি। তবে রোববার নওগাঁ, রংপুরসহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকা থেকে তাঁকে জানানো হয়েছে, জ্বালানি তেল পাওয়া যাচ্ছে না। তবে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে গাড়িগুলো তেল কিনতে পারছে; কিন্তু পরিমাণে কম। সরকার রেশনিং করে ট্রাক-কাভার্ডভ্যানে ২২০ লিটার কেনার সীমা বেঁধে দিলেও ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ের পাম্পগুলো গাড়িপ্রতি ৪০-৫০ লিটারের বেশি তেল বিক্রি করছে না। হাসানুল কবির আরও বলেন, আজ সোমবার তারা পোশাক মালিকদের সঙ্গে নিয়ে সরকারের সঙ্গে কথা বলবেন, যাতে রপ্তানিকে অগ্রাধিকার দিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে জ্বালানি তেলের প্রাপ্তি সহজলভ্য করার উদ্যোগ নেয়।
বিপিসিতে বড় রদবদল
জ্বালানি তেল নিয়ে সৃষ্ট নৈরাজ্যের মধ্যে গতকাল বিপিসিতে বড় ধরনের রদবদল হয়েছে। রোববার এ-সংক্রান্ত এক অফিস আদেশ জারি করা হয়। আদেশ অনুসারে ১২ কর্মকর্তাকে বদলি, নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত দায়িত্ব বা সংযুক্ত করা হয়েছে। তাদের আজ সোমবার কর্মস্থলে যোগদান করতে বলা হয়েছে।
বাড়ল জেট ফুয়েলের দাম
উড়োজাহাজ চলাচলে ব্যবহৃত জেট ফুয়েলের দাম বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন গতকাল প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম অভ্যন্তরীণ রুটের জন্য ১৭ টাকা ২৯ পয়সা বাড়িয়ে ১১২ টাকা ৪১ পয়সা নির্ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য প্রতি লিটারের দাম বেড়ে দশমিক ৭৩৮৪ ডলার হয়েছে।
একে