শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬

নারীরা আসলে কোথায় নিরাপদ?

শনিবার, মার্চ ১৪, ২০২৬
নারীরা আসলে কোথায় নিরাপদ?

শিরিনা বীথি: 

সত্যিই নারী হয়ে জন্মানোই পাপ?
রাত গভীর হলে অনেক বাবা-মা ছেলেকে বলেন—“সাবধানে যাস।” কিন্তু মেয়েকে বলেন—“একাই যাস না।” এই দুই বাক্যের মাঝেই লুকিয়ে আছে সমাজের এক নির্মম সত্য। একজন ছেলে পৃথিবীকে নিজের মতো করে ঘুরে দেখতে পারে, কিন্তু একজন মেয়েকে জন্মের পর থেকেই শিখতে হয় ভয়, সতর্কতা আর সীমারেখা। তখন প্রশ্ন জাগে—নারীরা আসলে কোথায় নিরাপদ? ঘরে, বাইরে, নাকি কোথাওই না?

একটি মেয়ে যখন জন্মায়, তখন তাকে ঘিরে থাকে অনেক স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্নের সঙ্গে সঙ্গে সমাজ তাকে অদৃশ্য কিছু শর্তও দিয়ে দেয়—এভাবে হাঁটো না, ওভাবে কথা বলো না, রাতে বের হয়ো না, বেশি হাসো না, বেশি কথা বলো না। যেন তার প্রতিটি আচরণের উপর সমাজের এক অদৃশ্য পাহারা বসে আছে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব নিয়ম মেনেও নারীরা নিরাপদ নয়।

বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক জায়গায় আমরা প্রতিদিন খবরের কাগজে দেখি—কোনো মেয়ে পথে হয়রানির শিকার হয়েছে, কোনো শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হয়েছে, কোনো নারী কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীর দ্বারা অপমানিত বা নির্যাতিত হয়েছে। এমনকি অনেক সময় নারীরা নিজের ঘরেও নিরাপদ থাকেন না। পারিবারিক সহিংসতা, মানসিক নির্যাতন, স্বামীর অবহেলা—এসব ঘটনা সমাজে খুবই সাধারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, অথচ সেগুলো নিয়ে অনেক সময় নীরবতা বজায় থাকে।

বাসের ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটি মেয়ে হয়তো প্রতিদিন এমন কিছু অস্বস্তিকর স্পর্শ সহ্য করে, যা সে কাউকে বলতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাওয়া একটি মেয়ে হয়তো প্রতিদিন কটূক্তি শুনে মাথা নিচু করে হাঁটে। কর্মক্ষেত্রে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করা একজন নারী হয়তো বারবার শুনতে বাধ্য হন—“তুমি তো নারী, এত কিছু পারবে?”
এসব ঘটনা শুধু একটি মানুষের নয়; এগুলো একটি সমাজের মানসিকতার প্রতিচ্ছবি।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো—অনেক সময় অপরাধীর চেয়ে ভুক্তভোগী নারীকে বেশি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়—কেন সেখানে গিয়েছিলে? কেন ওই পোশাক পরেছিলে? কেন একা বের হয়েছিলে? যেন অপরাধীর দায় সমাজের চোখে ধীরে ধীরে নারীর কাঁধেই এসে পড়ে।

তখন সত্যিই মনে হয়—এই সমাজে নারী হয়ে জন্মানো কি তবে একটি অভিশাপ? কিন্তু না, নারী হয়ে জন্মানো কোনো পাপ নয়। পাপ হলো সেই মানসিকতা, যা নারীকে মানুষ হিসেবে নয়, বরং দুর্বল বা নিয়ন্ত্রিত একটি সত্তা হিসেবে দেখতে চায়। নারী মানে শুধু কোমলতা নয়; নারী মানে শক্তি, ধৈর্য, ভালোবাসা এবং অদম্য সংগ্রাম।
একজন মা সন্তানের জন্য নিজের জীবন পর্যন্ত বাজি রাখেন। একজন নারী অসুস্থ শরীর নিয়েও পরিবারকে আগলে রাখেন। অনেক সময় তিনি নিজের কষ্ট, অবহেলা, অপমান সবকিছু চেপে রেখে অন্যদের সুখের জন্য বেঁচে থাকেন। তবু সমাজ তাকে যথাযথ সম্মান দিতে কৃপণতা করে।
সমাজকে বদলাতে হলে প্রথমে বদলাতে হবে আমাদের চিন্তাভাবনা। ছেলেদের ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে—নারী কোনো বস্তু নয়, তিনি একজন মানুষ। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র—সব জায়গায় এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে একজন নারী ভয় নয়, সম্মান নিয়ে বাঁচতে পারেন।

কারণ একটি সমাজ কখনোই সত্যিকারের উন্নত হতে পারে না, যদি সেই সমাজের অর্ধেক মানুষ ভয় নিয়ে বেঁচে থাকে।

শেষ কথা হলো—নারী হয়ে জন্মানো পাপ নয়। বরং লজ্জা সেই সমাজের, যেখানে একজন নারীকে প্রতিদিন প্রমাণ করতে হয় যে তিনি নিরাপদ থাকার অধিকার রাখেন।

যেদিন একটি মেয়ে রাতের অন্ধকারে হাঁটতে গিয়ে ভয় পাবে না, যেদিন তার স্বপ্নের পথে কোনো কটূক্তি বা হুমকি দাঁড়াবে না, সেদিনই আমরা সত্যিকারের সভ্য সমাজের দাবি করতে পারব।
তার আগে পর্যন্ত এই প্রশ্নটি আমাদের বিবেককে নাড়া দিতেই থাকবে—
নারীরা আসলে কোথায় নিরাপদ?

লেখক: শিরিনা বীথি 
সহযোগী অধ্যাপক 
রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগ,  ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়,  কুষ্টিয়া।


Somoy Journal is new coming online based newspaper in Bangladesh. It's growing as a most reading and popular Bangladeshi and Bengali website in the world.

উপদেষ্টা সম্পাদক: প্রফেসর সৈয়দ আহসানুল আলম পারভেজ

যোগাযোগ:
এহসান টাওয়ার, লেন-১৬/১৭, পূর্বাচল রোড, উত্তর বাড্ডা, ঢাকা-১২১২, বাংলাদেশ
কর্পোরেট অফিস: ২২৯/ক, প্রগতি সরণি, কুড়িল, ঢাকা-১২২৯
ইমেইল: somoyjournal@gmail.com
নিউজরুম ই-মেইল : sjnewsdesk@gmail.com

কপিরাইট স্বত্ব ২০১৯-২০২৬ সময় জার্নাল