ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম:
ব্যারিস্টার নওশাদ জমির তার লিখিত বক্তব্যে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে আইন মন্ত্রণালয় তথা আমলাতান্ত্রিক মহলের কিছু প্রস্তাবের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি যৌক্তিকভাবে দেখিয়েছেন যে, মানবাধিকার কমিশনকে কার্যকর করতে হলে তাকে অবশ্যই সরকারের যেকোনো ধরনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত রাখতে হবে।
১. লেজিসলেটিভ বিভাগের অধীনে রাখার ফাঁদ
আইন মন্ত্রণালয় কমিশনকে লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের অধীনে নিয়ে আসার যে প্রস্তাব দিয়েছে, নওশাদ জমির সেটির মূল উৎপাটন করেছেন। একটি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের (NHRC) প্রধান কাজই হলো রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের তদন্ত করা। যে সংস্থাটি নিজেই সরকারি বিভাগের অধীনে থাকবে, সেটি কীভাবে বিশ্বাসযোগ্যভাবে সরকারের বিরুদ্ধে তদন্ত করবে? এটি জাতিসংঘের প্যারিস প্রিন্সিপালসের (Paris Principles) সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
১. নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহিতা ও 'ওয়াচডগ' তত্ত্ব
সবচেয়ে বিতর্কিত এবং স্পর্শকাতর জায়গাটি ছিল নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তের ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমতির দাবি। বিগত দেড় দশকে বাংলাদেশে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সিংহভাগ অভিযোগই উঠেছে বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে। ব্যারিস্টার জমিরের সেই বিখ্যাত উক্তিটি এখানে প্রণিধানযোগ্য:
"A watchdog that must ask the permission of the institution it is watching before it can investigate is not a watchdog. It is a shield for that institution."
(যে পাহারাদারকে তদন্ত করার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানেরই অনুমতি নিতে হয়, সে পাহারাদার নয়; বরং ওই প্রতিষ্ঠানের ঢাল হিসেবে কাজ করে।)
অধ্যাদেশটি 'ল্যাপস' বা বাতিল হলে যে ভয়াবহ বিপদ অপেক্ষা করছে
কমিটিতে প্রস্তাব করা হয়েছে যে অধ্যাদেশটি বাতিল (Lapse) হতে দিয়ে পরবর্তীতে নতুন আইন করা হোক। আপাতদৃষ্টিতে এই প্রস্তাবটিকে সাধারণ মনে হলেও এর পেছনে যে ভয়াবহ আইনি ও আন্তর্জাতিক জটিলতা লুকিয়ে আছে, তা ব্যারিস্টার জমির অত্যন্ত নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করেছেন:
আন্তর্জাতিক কনভেনশন লঙ্ঘনের ঝুঁকি: বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই গুম বিরোধী আন্তর্জাতিক কনভেনশন এবং ‘অপক্যাট’ (OPCAT)-এ স্বাক্ষর করেছে। এই অধ্যাদেশ বাতিল হলে নির্যাতন বিরোধী 'জাতীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা'র (NPM) আইনি ভিত্তি হারিয়ে যাবে। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ বড় ধরনের অঙ্গীকার ভঙ্গের দায়ে পড়বে।
স্ট্যাটাস-এ (Status A) অর্জনের পথ রুদ্ধ হওয়া: দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকারের তলানিতে অর্থাৎ 'স্ট্যাটাস-বি' (Status B) ক্যাটাগরিতে পড়ে আছে। এই অধ্যাদেশটির মাধ্যমে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের সামনে 'স্ট্যাটাস-এ' (সর্বোচ্চ মর্যাদা) পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। অধ্যাদেশ বাতিল হলে সেই পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
বিএনপির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও সরকারের প্রথম বার্তা
ব্যারিস্টার নওশাদ জমিরের চিঠির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি ছিল এর রাজনৈতিক সতর্কতা। তিনি দলীয় নেতৃত্বের চোখ খুলে দেওয়ার মতো করে বলেছেন, এই অধ্যাদেশটি যদি সামান্য দুটি সংশোধন (ধারার অস্পষ্টতা দূর করা এবং ব্যক্তিগত দায়ের পরিমার্জন) সহ পাস করা না হয়, তবে বহির্বিশ্বে এবং দেশের জনগণের কাছে অত্যন্ত নেতিবাচক একটি বার্তা যাবে।
দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনের অবসানের পর জনগণ একটি চরম মানবাধিকারবান্ধব রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রত্যাশা করে। এমতাবস্থায় সরকারের একেবারে প্রথম মাসেই যদি মানবাধিকার কমিশনের ক্ষমতা খর্ব করা হয় বা অধ্যাদেশ বাতিল হতে দেওয়া হয়, তবে দেশ-বিদেশের বোদ্ধামহল এটিকে মানবাধিকারের প্রতিশ্রুতি থেকে বর্তমান সরকারের "পিছুটান" বা "পিছু হটা" (Retreat) হিসেবেই পাঠ করবে। এটি কোনোভাবেই একটি গণতান্ত্রিক এবং জনআকাঙ্ক্ষী সরকারের রাজনৈতিক স্বার্থের অনুকূলে যাবে না।
একটি দেশের মানবাধিকার কমিশন কতটা শক্তিশালী, তার ওপর নির্ভর করে সেই দেশের গণতন্ত্রের পরিপক্কতা। ব্যারিস্টার নওশাদ জমির অত্যন্ত প্রাজ্ঞতার সাথে আইনি সূক্ষ্মতা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতাকে এক সুতোয় গেঁথেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, অতীতের দায়মুক্তির সংস্কৃতি ও ঠুঁটো জগন্নাথ মার্কা কমিশন গড়ার যে সনাতনী আমলাতান্ত্রিক প্রবণতা, তা থেকে বেরিয়ে আসার এখনই উপযুক্ত সময়।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের উচিত হবে এই সংসদ সদস্যের বস্তুনিষ্ঠ ও সাহসী বিশ্লেষণকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নেওয়া। ব্যক্তিস্বার্থ বা দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে মানবাধিকার কমিশনকে পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করাই হবে এই মুহূর্তের সবচেয়ে সময়োপযোগী ও কাঙ্ক্ষিত সিদ্ধান্ত।
লেখক : ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম, কলামিষ্ট, সমাজ সেবক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, মানবাধিকার কর্মী ও রাজনীতিবিদ।
চেয়ারম্যান -বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গবেষণা কেন্দ্র, চেয়ারম্যান - সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট
চেয়ারম্যান - ডেমোক্রেসি রিসার্চ সেন্টার (ডিআরসি)
এমআই