বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬

জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প : বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সাথে পরিবেশ দূষণ

বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২৩, ২০২৬
জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প : বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সাথে পরিবেশ দূষণ

আরমীন আমীন ঐশী:

সাগরের ঢেউয়ে ভেসে আসে ধাতব দৈত্যেরা,তারা নিঃশব্দে উপকূলে ভেঙ্গে পড়ে,রেখে যায় অর্থ আর বিষ।চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে গেলে এক অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ে, সমুদ্রে ঢেউয়ের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে অজস্র বিশাল ধাতব দানব,যেগুলো এখানে এসেছে শেষ সময় কাটাতে।পরিত্যক্ত জাহাজগুলো ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে।যেন সমুদ্র থেকে তুলে আনা হচ্ছে সোনা কিন্তু এর সাথে মিশে আছে বিষ। একদিকে হাজার হাজার মানুষ সেখানে কাজ করে ঘরে নিয়ে যায় পেটের ভাতের টাকা।অন্যদিকে, সেই একই জায়গা থেকে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে বিষাক্ত রাসায়নিক, ধোঁয়া, গ্যাস আর তেল।এই হলো আমাদের চট্টগ্রামের জাহাজ ভাঙ্গা শিল্পের বাস্তব অবস্থা। 

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জাহাজ ভাঙ্গার দেশ।বাংলাদেশে এই শিল্প মূলত গড়ে উঠেছে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলজুড়ে।যেসব জাহাজ বিশ্বের অন্যান্য দেশে আর চলে না,পুরনো হয়ে যায় সেগুলো কিনে এখানে আনা হয়।তারপর একে একে ধাতব পাতগুলো কেটে ফেলা হয়,ভেঙে নেওয়া হয় মেশিন,যন্ত্রাংশ, স্টিল।সেগুলো কাজে লাগানো হয় দেশের বিভিন্ন শিল্পে। এই প্রক্রিয়ায় যেমন বিদেশ থেকে টাকা আসে,তেমনি হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়।এমনও দেখা গেছে,একটা জাহাজ ভেঙেই কয়েক কোটি টাকার লোহা চলে আসে।তাই অনেকেই এই শিল্পকে বলেন চলন্ত খনি।

বাংলাদেশে বছরে গড়ে ২০০টা জাহাজ ভাঙ্গা হয়।প্রতিটা জাহাজের দৈর্ঘ্য প্রায় ২০০ – ৩০০ মিটার পর্যন্ত হয় এবং ভাঙতে সময় লাগে ৩ – ৪ মাস।এই সময়টাতে শত শত শ্রমিক জাহাজের ভেতর ঢুকে  কাটাকাটি করে,মেটাল খুলে ফেলে,আগুন জ্বালিয়ে দেয় তেলের পাত্র। তবে,এই কাজটি অত্যন্ত বিপদজনক। কারণ জাহাজগুলোর মধ্যে থাকে অ্যাসবেস্টস, পুরোনো তেল,রেডিওঅ্যাক্টিভ উপাদান, পারদ এবং আরও অনেক ক্ষতিকর রাসায়নিক। এগুলো যখন সঠিকভাবে নিষ্কাশন না করে খোলা পরিবেশে ফেলা হয় তখন তা আশেপাশের মাটি,পানি ও বাতাসকে নষ্ট করে দেয়। অনেক শ্রমিক শ্বাসকষ্ট, ত্বকের রোগ,ক্যান্সার সহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হয়।তাদের কথা খুব কম মানুষই জানে কারণ এগুলো নিয়ে খবর হয় না,চাপা পড়ে যায়।

জাহাজ ভাঙ্গা থেকে  আমাদের যে ক্ষতি হচ্ছে সেটা হঠাৎ করে হচ্ছে না।এর পেছনে অনেকগুলো বাস্তব কারণ আছে যেগুলা জানা খুবই জরুরি। অনেক সময়েই সরকারি নিয়ম মেনে চলা হয় না।কাগজে কলমে সব ঠিক থাকলেও বাস্তবে অনেক অনিয়ম চলে। জাহাজ থেকে যে পরিমাণ ধাতব উপাদান পাওয়া যায় তা থেকে প্রচুর টাকা রোজগার হয়।এই লাভের কারণে মালিকরা ঝুঁকি নিতে দ্বিধাবোধ করেন না।দরিদ্র মানুষ কাজের আশায় দিনমজুর হয়ে আসে।অল্প টাকা পেলেও তারা রাজি হয় প্রাণ নিয়ে ঝুঁকি নিতে।উন্নত দেশে যেভাবে জাহাজ ভেঙে নিরাপদভাবে  বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা হয়,সেই প্রযুক্তি বাংলাদেশে নেই।শ্রমিকদের অনেকেই জানেনা তারা ঠিক কতটা বিপদের মধ্যে আছেন।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটা সুন্দর পৃথিবী রেখে যেতে হলে আমাদের এখনই ভাবতে হবে এই বিপদের পথ থেকে কিভাবে বের হওয়া যায়।সমস্যার দিকে আঙ্গুল তুলতে সবাই পারে কিন্তু আসল কাজ হলো সমাধানের পথে হাঁটা।

প্রতিটি জাহাজ ভাঙ্গার আগে চেক করতে হবে সেখানে কোনো ক্ষতিকর উপাদান আছে কি না।বিদেশ থেকেও আগে এসব পরিষ্কার করে আনা দরকার।সঠিক প্রশিক্ষণ, হেলমেট, মাস্ক,সেফটি গিয়ার ছাড়া কাউকে কাজ করতে দেওয়া উচিত না।জাহাজ ভাঙ্গার সময় বর্জ্য কীভাবে ফেলা হবে তা নিয়ন্ত্রণ কারার জন্য প্রয়োজনীয় মেশিন লাগানো জরুরি। নিয়মিত পরিবেশ অধিদপ্তরের তদারকি ও  জরিমানা ব্যবস্থা চালু রাখতে হবে।স্থানীয় জনগণ, শ্রমিক এমনকি শিল্প মালিকদের মাঝেও সচেতনতা বাড়াতে হবে।এখানে শুধু টাকা নয়,সাথে পরিবেশ, জীবনও জড়িত। 

একদিকে দেশের মানুষ কাজ পাচ্ছে, সরকার বৈদেশিক মুদ্রা পাচ্ছে, এসব দিক ভালো আছে। কিন্তু এসবের পেছনে যদি পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে এই লাভের কোনো মূল্য থাকেনা। আমাদের উচিত এই শিল্পটিকে বন্ধ না করে সঠিকভাবে পরিচালনা করা। উন্নত দেশগুলোর মতো নিরাপদ ভাবে, পরিবেশের ক্ষতি না করে জাহাজ ভাঙ্গা সম্ভব। কিন্তু তার জন্য দরকার সদিচ্ছা,কঠোর নিয়ম ও দায়িত্ববান মনোভাব। আমরা যদি এখনো সচেতন না হই তাহলে আগামী দিনের সীতাকুণ্ড হবে বিষাক্ত বালুর মাঠ। সমুদ্র থাকবে না, থাকবে বিষে ভরা পানি। তখন হয়তো এই লাভও আমাদের কোনো কাজে আসবে না।

লেখক: শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়


Somoy Journal is new coming online based newspaper in Bangladesh. It's growing as a most reading and popular Bangladeshi and Bengali website in the world.

উপদেষ্টা সম্পাদক: প্রফেসর সৈয়দ আহসানুল আলম পারভেজ

যোগাযোগ:
এহসান টাওয়ার, লেন-১৬/১৭, পূর্বাচল রোড, উত্তর বাড্ডা, ঢাকা-১২১২, বাংলাদেশ
কর্পোরেট অফিস: ২২৯/ক, প্রগতি সরণি, কুড়িল, ঢাকা-১২২৯
ইমেইল: somoyjournal@gmail.com
নিউজরুম ই-মেইল : sjnewsdesk@gmail.com

কপিরাইট স্বত্ব ২০১৯-২০২৬ সময় জার্নাল