হাম্মাদ, ইবি প্রতিনিধি:
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) শাখার নতুন কমিটির গুঞ্জন উঠেছে। এতে গুটিকয়েক সিনিয়রসহ তরুন কয়েকজন ছাত্রনেতার নাম উঠে এসেছে। তবে নানান কারনে বিতর্কিত এবং বয়সের ব্যবধান বেশি থাকায় সিনিয়র প্রার্থীদের পরিবর্তে তরুণ নেতৃত্বের প্রতি আস্থা খুঁজে পাচ্ছেন অধিকাংশ শিক্ষার্থীরা। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আছেন শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সদস্য রাফিজ আহমেদ ও নূর উদ্দিন।
জানা যায়, দীর্ঘ ৫ বছর যাবৎ শাখা ছাত্রদলের বর্তমান কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্বে আছেন লোক প্রশাসন বিভাগের ২০০৭-০৮ শিক্ষাবর্ষের সাহেদ আহম্মেদ। সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ইংরেজি বিভাগের ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের মাসুদ রুমী মিথুন। ২০২১ সালের ১৬ জুন ৩১ সদস্যের তিন মাস মেয়াদি এ আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল। তবে পাঁচ বছরেও পূর্ণাঙ্গ হয়নি এ কমিটি। কমিটির অধিকাংশ সদস্যই বর্তমানে অছাত্র এবং দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয়। কেউ কেউ বিবাহিত ও চাকুরিজীবী। যেকারণে জুলাই বিপ্লবের পর থেকেই নতুন ও তরুণ নেতৃত্বের দাবি জানিয়ে আসছিল দলটির কর্মী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
এদিকে দলীয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন নেতৃত্বের আলোচনায় আছেন শাখা ছাত্রদলের বর্তমান সদস্য সচিব মাসুদ রুমি মিথুন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী, স্নাতক পরীক্ষার ফল প্রকাশের ২০ দিনের মধ্যে মানোন্নয়ন পরীক্ষার আবেদনের নিয়ম থাকলেও ফল প্রকাশের আট বছর পর মানোন্নয়নের আবেদন করে গতবছর ক্যাম্পাসে সমালোচনার সৃষ্টি করেন তিনি। এছাড়া বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের চেয়ে তার বয়সের ব্যবধান ১০ বছরেরও বেশি হওয়ায় তাকে নতুন কমিটিতে পুনরায় চাচ্ছেন না দলের অধিকাংশ কর্মীরা। সিনিয়রদের মধ্যে তিনি ছাড়া আলোচনায় আছেন দলটির বর্তমান যুগ্ম আহ্বায়ক আনোয়ার পারভেজ। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। তবে নানান কারণেই বিতর্কিত এ নেতা। ২০২১ সালে বর্তমান আহ্বায়ক কমিটি আসার পরপরই কমিটিকে বয়কট করেছিলেন তিনি। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর গভীর রাতে তার রুম থেকে আপত্তিকর অবস্থায় ধরা পড়ে এক প্রেমিক যুগল। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ডিন্যান্স বহির্ভূতভাবে নিয়মিত মাস্টার্সে পুনঃভর্তি হয়েও সমালোচনার জন্ম দিয়েছিলেন তিনি। সর্বশেষ এ বছরের শুরুর দিকে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে কারণ দর্শানোর নোটিশ পায় এ ছাত্রনেতা।
এদিকে তরুণদের মাঝে আলোচনায় আছেন দলটির আহ্বায়ক সদস্য রাফিজ আহমেদ ও নূর উদ্দিন। এছাড়া আলোচনায় আছেন রাকিবুল ইসলাম স্বাক্ষর, আবু সাইদ রনি ও তৌহিদুল ইসলাম সহ আরও কয়েকজন তরুন নেতা। তবে সবাইকে ছাপিয়ে শিক্ষার্থীদের নজর কেড়েছেন রাফিজ আহমেদ ও নূর উদ্দিন। এ দুজনের মধ্যে রাফিজ আহমেদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স ব্যাংকিং বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। কিশোর বয়স থেকেই তিনি যুক্ত হন ছাত্র রাজনীতিতে। আওয়ামী সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে গিয়ে বেশ কয়েকবার ছাত্রলীগের নির্যাতনের শিকারও হয়েছেন তিনি। এছাড়া সম্প্রতি কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়ক সংস্কারে মন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি দেওয়া, ফরম ফিল আপ এর জন্য এক শিক্ষার্থীকে আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা, ঝিনাইদহ রুটে বাস ঘাটতি দূরীকরণে জোর দাবি তোলাসহ শিক্ষার্থীবান্ধব নানান দাবি তুলে প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি। এদিকে নূর উদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগের একই শিক্ষাবর্ষের মেধাবী শিক্ষার্থী। নিজের বিভাগের ভালো ফলাফলকারীদের তালিকায়ও রয়েছেন তিনি। তাছাড়া বিভাগ ডিবেটিং ক্লাবের সভাপতি ও হল ডিবেটিং সোসাইটির সহ-সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে আস্থাভাজন থাকায় এ দুই তরুণ ছাত্রনেতাকেই কমিটিতে চাচ্ছেন তরুণ ছাত্রসমাজ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হাসিব মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, ইবি ছাত্রদলে একইসাথে নতুন ও নিয়মিত তরুণ নেতৃত্ব আশা করছি। তরুণ নেতৃত্ব মানে, নতুন এবং ইফিসিয়েন্ট চিন্তাভাবনা। যা পুরনো নীতিনিয়মে আবদ্ধ একটি মরিচাপড়া দলকে দৃঢ়, সুসংগঠিত করবে। সেই হিসেবে নূর ভাই ও রাফিজ ভাই কমিটিতে আসলে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে বলে আশা রাখি।
আরেক শিক্ষার্থী নুদরাত নাওয়ার প্রাপ্তি বলেন, ইবি ছাত্রদলে তরুণ, উদ্যমী ও নিয়মিত শিক্ষার্থীদের বাস্তবতার সঙ্গে সম্পৃক্ত নেতৃত্বের প্রত্যাশা করছি। এ তরুণ নেতৃত্ব সংগঠনে সৃজনশীল, আধুনিক ও সময়োপযোগী চিন্তাভাবনার মাধ্যমে কার্যকর উদ্যোগ এনে দলকে আরও সুসংগঠিত করতে পারবে বলে আশা রাখি।
শাখা ছাত্রদলের কর্মী আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, নতুন কমিটিতে আমরা এমন কোনো নেতৃত্ব চাইনা যাদের সাথে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিন্দুমাত্র সংযোগ নেই। অবশ্যই এমন নেতৃত্ব চাই যেখানে সাধারণ শিক্ষার্থীরা আস্থা রাখতে পারে। আমরা চাই, ত্যাগী ও যোগ্যদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে জনপ্রিয়তার নিরিখে রাফিজ আহমেদ ভাই, নুর উদ্দিন ভাইয়ের নেতৃত্বেই আগামীর কমিটি হবে বলে আমরা আশা রাখছি।
আরেক কর্মী জিন্নাত মালিয়াত সীমা বলেন, ইবি ছাত্রদলে নিয়মিত, দায়িত্বশীল ও তরুণ নেতৃত্বের খুব প্রয়োজন। যারা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সবসময় যোগাযোগ রাখবে, তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেবে এবং ক্যাম্পাসের ইতিবাচক পরিবেশ বজায় রাখতে কাজ করবে। নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব সংগঠনে গতিশীলতা ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে আস্থা তৈরি করবে।
এ ব্যাপারে রাফিজ আহমেদ বলেন, ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সর্বদাই তরুনদের প্রতি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। সেই নির্দেশনা অনুসরণ করে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল নিয়মিত শিক্ষার্থীদেরকে দিয়ে সব কমিটি গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তাছাড়া শিক্ষার্থীরা তরুনদেরকেই নেতৃত্বে দেখতে চাই। তাই আশা রাখছি ইবির নতুন কমিটিতে তরুনদেরকেই স্থান দেওয়া হবে। এই কমিটি হবে শিক্ষার্থীবান্ধব, দায়িত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক। যা শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে সর্বদা সক্রিয় ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।
নূর উদ্দিন বলেন, ইবি ছাত্রদলের কমিটি দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয়ভাবে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। নিয়মিত শিক্ষার্থীরা কমিটি নিয়ে আগ্রহী, উৎসাহী এবং নিজেদের যথাযথ মূল্যায়নের বিষয়ে আশাবাদী। আমাদের ভারপ্রাপ্ত অভিভাবক থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ নিয়মিত শিক্ষার্থীদের নিয়ে কমিটি গঠনের যে আশ্বাস দিয়েছেন, আমরা বিশ্বাস করি তাঁরা সেই অঙ্গীকার রক্ষা করবেন। চলমান স্টুডেন্টদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে ছাত্রদল তার হারানো ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করবে বলেও আমরা আশাবাদী। একই সঙ্গে, দীর্ঘমেয়াদি কমিটি পদ্ধতির পরিবর্তে নিয়মিত কমিটি গঠনের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত রাখা হবে। সাংগঠনিক নিয়মনীতি মেনে সকলের জন্য নেতৃত্বে নিজেদের যোগ্যতা তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি হবে—যা সংগঠনকে আরও গতিশীল, সুসংগঠিত ও কার্যকর করে তুলবে।
এমআই