আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
২০২৬ সালের ৩ মার্চ। স্থানীয় সময় দুপুর ২টা। ইরাকের দুর্গম পশ্চিম মরুভূমিতে এক বেদুইন শিবিরের বাসিন্দারা একটি ট্রাক যেতে দেখেন। এটি ছিল স্থানীয় এক মেষপালকের গাড়ি। গাড়িটি কাছেই আল-নুখাইব শহরের দিকে যাচ্ছিল।
তবে কয়েক ঘণ্টা পর ট্রাকটি ফিরে আসতে দেখেন তারা। তবে সেটি আর অক্ষত ছিল না। যেন অসংখ্য গুলিতে ট্রাকটি ঝাঁঝড়া হয়ে গেছে। ট্রাকটির কোনো অংশ আগুনও জ্বলছিল।
শিবিরের তিনজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, একটি হেলিকপ্টার ট্রাকটিকে ধাওয়া করছিল এবং সেখান থেকে অনবরত গুলি ছোড়া হচ্ছিল। একপর্যায়ে ট্রাকটি মরুভূমিতে থেমে যায়।
ট্রাকটি চালাচ্ছিলেন ২৯ বছর বয়সি আওয়াদ আল-শাম্মারি। তিনি বাজার করার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন। পথে এ হামলার ঘটনা ঘটে। নিহত আওয়াদের চাচাতো ভাই আমির আল-শাম্মারি নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানান, আওয়াদ ঘটনাবশত এমন এক গোপন ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটির সন্ধান পেয়েছিলেন, যা ইরাকের মরুভূমিতে গোপন অবস্থায় ছিল। তাদের ধারণা, এই ঘাঁটির সন্ধান পাওয়ার কারণেই হয়তো আওয়াদের প্রাণ গেছে।
আওয়াদের এই সন্ধানের মধ্যে দিয়ে এটা স্পষ্ট যে, ইরাকে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে গোপনে ইসরায়েলি দুটি ঘাঁটি পরিচালিত হয়ে আসছিল। উল্লেখ্য, ইসরায়েলকে শত্রু রাষ্ট্র হিসেবে মনে করে ইরাক।
আঞ্চলিক সামরিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আওয়াদ এক সময় ইরাকের আঞ্চলিক সামরিক কমান্ডে ফোন করে জানিয়েছিলেন, তিনি কিছু সৈন্য, হেলিকপ্টার এবং তাঁবু দেখতে পেয়েছেন। ইরাকের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনায় সহায়তার জন্য ইসরায়েল সেখানে এই ঘাঁটি পরিচালনা করছিল।
ইরাকে ইসরায়েলি ঘাঁটির উপস্থিতির খবর এর আগে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল প্রকাশ করেছিল। তবে ইরাকের কর্মকর্তারা নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানান, পশ্চিম মরুভূমিতে আরও একটি দ্বিতীয় গোপন ঘাঁটি ছিল, যা আগে প্রকাশিত হয়নি।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতে, আওয়াদ যে ঘাঁটির সন্ধান পেয়েছিলেন, সেটি যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার সাম্প্রতিক যুদ্ধের আগেই স্থাপন করা হয়েছিল এবং ২০২৫ সালের জুনে তেহরানের বিরুদ্ধে ১২ দিনের যুদ্ধে এটি ব্যবহার করা হয়েছিল।
একজন আঞ্চলিক কর্মকর্তা জানান, ভবিষ্যৎ সংঘাতের কথা মাথায় রেখে ইসরায়েল ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকেই অস্থায়ী এই ঘাঁটি তৈরির প্রস্তুতি শুরু করেছিল এবং দূরবর্তী এলাকাগুলো চিহ্নিত করছিল।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর কাছে এসব ঘাঁটি ও আওয়াদের হত্যাকাণ্ড নিয়ে বারবার জানতে চাইলেও তারা কোনো জবাব দেয়নি।
আওয়াদের মৃত্যুর প্রত্যক্ষদর্শীরা নিরাপত্তাজনিত কারণে নাম প্রকাশ করতে চাননি। একইভাবে, ইসরায়েলি ঘাঁটি নিয়ে কথা বলা অধিকাংশ কর্মকর্তাও পরিচয় গোপন রাখতে চান।
তাদের দেওয়া তথ্য থেকে বোঝা যায়, অন্তত একটি ঘাঁটির বিষয়ে, অর্থাৎ যেটি আওয়াদ আবিষ্কার করেছিলেন, সেটির বিষয়ে ওয়াশিংটন ২০২৫ সালের জুন বা তারও আগে থেকেই জানত। এর অর্থ হতে পারে, ইরাকের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ইরাককে এটা জানায়নি যে তাদের ভূখণ্ডে একটি শত্রু শক্তি (ইসরায়েলি বাহিনী) সক্রিয় রয়েছে।
ইরাকি আইনপ্রণেতা ওয়াদ আল-কাদু বলেন, 'এটি ইরাকের সার্বভৌমত্ব, সরকার, নিরাপত্তা বাহিনী এবং জনগণের মর্যাদার প্রতি প্রকাশ্য অবজ্ঞা।'
আঞ্চলিক কর্মকর্তারা বলেন, ইরাকে গোপনে কার্যক্রম চালানো নিরাপদ হবে— এমন সিদ্ধান্ত নিতে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরাকের নিরাপত্তা সহযোগিতাকেই বিবেচনায় নিয়েছিল।
দুই ইরাকি নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, গত বছরের যুদ্ধ এবং বর্তমান সংঘাত উভয় সময়েই ওয়াশিংটন ইরাককে তাদের রাডার ব্যবস্থা বন্ধ রাখতে বাধ্য করেছিল, যাতে মার্কিন বিমান নিরাপদে চলাচল করতে পারে। এর ফলে শত্রু তৎপরতা শনাক্ত করতে বাগদাদকে আরও বেশি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হয়।
এই ঘাঁটির তথ্য প্রকাশ পাওয়ায় ইরাকের জন্যও অস্বস্তিকর কিছু প্রশ্ন সামনে এসেছে। যেমন— একজন মেষপালক বিষয়টি প্রকাশ না করা পর্যন্ত কি সত্যিই ইরাকি বাহিনী বিদেশি উপস্থিতি সম্পর্কে জানত না? নাকি তারা জানার পরেও চুপ ছিল?
যে সম্ভাবনাই সত্য হোক না কেন, এ থেকে স্পষ্ট হয় যে ওয়াশিংটন ও তেহরানের দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের মধ্যে আটকে থাকা ইরাক এখনো নিজের ভূখণ্ডের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।
ওয়াদ আল-কাদু বলেন, 'আমাদের নিরাপত্তা নেতাদের অবস্থান লজ্জাজনক।'
ইরাকি সামরিক বাহিনীর পশ্চিম ইউফ্রেটিস ফোর্সের কমান্ডার মেজর জেনারেল আলি আল-হামদানি বলেন, মেষপালকের আবিষ্কারের এক মাস আগেই সেনাবাহিনী মরুভূমিতে ইসরায়েলি উপস্থিতির সন্দেহ করেছিল।
তিনি বলেন, 'এখন পর্যন্ত সরকার এ বিষয়ে নীরব রয়েছে।'
ইসরায়েলি ঘাঁটির বিষয়টি স্বীকার করা ইরাক সরকারের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর। কারণ, ইরাকের সঙ্গে ইসরায়েলের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই এবং দেশটির জনগণ ইসরায়েলকে শত্রু হিসেবেই দেখে।
ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাদ মান নিউ ইয়র্ক টাইমসকে বলেন, 'ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটির অবস্থান সম্পর্কে ইরাকের কাছে কোনো তথ্য নেই।'
দুই আঞ্চলিক নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, আওয়াদ যে ঘাঁটিটি উন্মোচন করেছিলেন, সেটি ইসরায়েল বিমান সহায়তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং চিকিৎসা সেবার জন্য ব্যবহার করত।
ঘাঁটিটি স্থাপন করা হয়েছিল যাতে ইসরায়েলি বিমানকে ইরানে পৌঁছাতে কম দূরত্ব অতিক্রম করতে হয়। এটি মূলত অস্থায়ী উপস্থিতি হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল, বিশেষ করে ২০২৫ সালের জুনের যুদ্ধের মতো সামরিক অভিযানে সহায়তার জন্য। কর্মকর্তাদের মতে, সেই যুদ্ধে ঘাঁটিটি অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়।
গত বছরের যুদ্ধের পর দেওয়া এক ভাষণে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামির বলেন, ইসরায়েলের সামরিক অভিযান সফল করা সম্ভব হয়েছে 'বিমান বাহিনী ও স্থল কমান্ডো বাহিনীর সমন্বয় এবং কৌশলগত বিভ্রান্তিমূলক তৎপরতার' মাধ্যমে।
পেন্টাগনের সেন্ট্রাল কমান্ড ইরাকে ইসরায়েলি কার্যক্রম নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। জানতে চাইলেও এটি ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগের কথা জানায়।
তবে অঞ্চলটিতে দায়িত্ব পালন করা সাবেক মার্কিন সামরিক কমান্ডার, পেন্টাগন কর্মকর্তা ও কূটনীতিকরা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিবেচনায় পশ্চিম ইরাকে ইসরায়েলি উপস্থিতির বিষয়ে সেন্ট্রাল কমান্ড কিছুই জানত না — এমনটা কল্পনাও করা যায় না।
এমআই