শনিবার, ৩০ মে ২০২৬

গাজা নিয়ে ইসরায়েলের পরিকল্পনা আসলে কী?

শনিবার, মে ৩০, ২০২৬
গাজা নিয়ে ইসরায়েলের পরিকল্পনা আসলে কী?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

টানা দুই বছরের নৃশংস বোমাবর্ষণ এবং স্থল অভিযানের পর গাজায় ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ কী—তা ২০২৫ সালের ৯ অক্টোবর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফার শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়েছে বলেই মনে হয়েছিল।

চুক্তির শর্তানুযায়ী, ইসরায়েলি বাহিনীর গাজার 'ইয়েলো লাইন' বা হলুদ রেখার পেছনে পিছু হটার কথা ছিল। এর মাধ্যমে গাজার ৫৮ শতাংশ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখে বাকি অংশ থেকে পরবর্তীতে একটি নির্দিষ্ট সময়ে তাদের সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করার কথা বলা হয়েছিল।

কিন্তু সেই সেনা প্রত্যাহার তো হয়ইনি, উল্টো তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতি’র পর থেকে প্রায় প্রতিদিনের হামলায় অন্তত ৯২২ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করার পাশাপাশি গাজায় নিজেদের নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ড আরও প্রায় ১১ শতাংশ বাড়িয়েছে ইসরায়েল।

গত মার্চ মাসে সংগৃহীত কৃত্রিম উপগ্রহের (স্যাটেলাইট) তথ্য অনুযায়ী, সাময়িক সীমান্ত রেখা হিসেবে নির্ধারিত এলাকার পাশাপাশি ইসরায়েল ইতিমধ্যে অন্তত ৩২টি সামরিক আউটপোস্ট বা চৌকি, একটি স্থল প্রতিবন্ধক এবং অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ করেছে।

গত বছরের অক্টোবর থেকে অক্সফামসহ বহু আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা অভিযোগ করে আসছে যে, ত্রাণ ও অন্যান্য জরুরি পণ্যের প্রবেশাধিকার সীমিত করে গাজার মানবিক সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে ইসরায়েল।

এমন পরিস্থিতির মধ্যেই গত বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ঘোষণা করেছেন যে, ইসরায়েল গাজার আরও ভূখণ্ড দখল করতে যাচ্ছে। এক সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আমরা বর্তমানে হামাসকে চেপে ধরেছি। আপনারা জানেন যে, আমরা এখন গাজা উপত্যকার ৬০ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছি, যা আগে ছিল ৫০ শতাংশ। আমার নির্দেশ হলো একে আরও এগিয়ে’।

নেতানিয়াহু এই পর্যায়ে কিছুটা থামতেই উপস্থিত দর্শক সারি থেকে একজন চিৎকার করে বলে ওঠেন,  ‘১০০ শতাংশ!’

জবাবে নেতানিয়াহু বলেন, ‘আসুন আমরা ধাপে ধাপে এগোই। প্রথমত ৭০ শতাংশ; এটা দিয়ে শুরু করা যাক। আমরা তাদের সবদিক থেকে চেপে ধরছি, বাকিদেরও আমরা দেখে নেব।’

এই বক্তব্যের বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যার জন্য আল জাজিরার পক্ষ থেকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলেও প্রতিবেদনটি প্রকাশের সময় পর্যন্ত কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

ইসরায়েল কি এভাবে গাজার আরও জমি দখল করতে পারে?

ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের অধ্যাপক মাইকেল বেকার বলেন, ইসরায়েলের চূড়ান্ত পরিকল্পনা যদি সমগ্র গাজা উপত্যকার ওপর স্থায়ী ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়, তবে তা হবে একটি অবৈধ দখলদারিত্ব বা অ্যানেক্সেশন।

তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) ২০২৪ সালের একটি পরামর্শমূলক মতামতে পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ভূখণ্ড দখল করা আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নিষেধাজ্ঞার স্পষ্ট লঙ্ঘন।

তা সত্ত্বেও, ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় গাজায় নারী ও শিশুসহ অন্তত ৭২,৮১৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ধসে পড়া ঘরবাড়ির ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ রয়েছেন আরও হাজার হাজার মানুষ, যাদের মৃত বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে।

২০২৫ সালের মধ্যেই ইসরায়েল এই উপত্যকায় একটি নিশ্চিত দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করেছে এবং জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের অবকাঠামো ধ্বংস করে দিয়েছে। বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিবাদ সত্ত্বেও কোনো ধরনের কার্যকর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ছাড়াই ইসরায়েল এই কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে, এমনকি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ও বিনোদনমূলক প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশও নিচ্ছে।

আমেরিকা ইসরায়েলের ওপর নিজস্ব শর্ত আরোপ করতে পারে—এমন আশার আলোও এখন ম্লান। গত বছরের অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে ইসরায়েল যেভাবে সেখানে নিজেদের উপস্থিতি বাড়িয়েছে ও সুসংহত করেছে, তার বিরুদ্ধে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাতে ব্যর্থ হয়েছে মার্কিন প্রশাসন। এর ফলে ২০২৬ সালের এপ্রিলের মধ্যে গাজার বাসিন্দাদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকার প্রবেশাধিকার বন্ধ হয়ে গেছে।

এই বিষয়ে মন্তব্যের জন্য আল জাজিরার পক্ষ থেকে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সাথে যোগাযোগ করা হলেও কোনো সাড়া মেলেনি।

এমন সংকুচিত ভূখণ্ডে গাজার জনগণ কি টিকে থাকতে পারবে?

এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া অত্যন্ত কঠিন। জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয়কারী সংস্থা (ওসিএইচএ) সহ বেশ কয়েকটি সংস্থা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছে যে, গাজার অবশিষ্ট জনসংখ্যা কীভাবে এই ক্রমাগত সংকুচিত হতে থাকা জায়গায় টিকে থাকবে, তা বলা মুশকিল।

তবে ইসরায়েলের কাছে এর সমাধান একেবারেই সহজ। চলতি সপ্তাহের বুধবার হামাস নেতা মোহাম্মদ ওদেহ-এর নিহতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ লিখেছেন, গাজা থেকে স্বেচ্ছায় অভিবাসনের পরিকল্পনাটিও বাস্তবায়ন করা হবে; তবে সব কিছুই সঠিক সময়ে এবং সঠিক উপায়ে।

এই ‘স্বেচ্ছায় অভিবাসন’ শব্দটি ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গ্যভির এবং অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচসহ বেশ কয়েকজন সরকারি মন্ত্রী নিয়মিত ব্যবহার করে আসছেন। বিশ্লেষকরা সাধারণত একমত যে, এর আসল অর্থ হলো গাজা উপত্যকা থেকে ফিলিস্তিনিদের সম্পূর্ণ জাতিগত নিধন (এথনিক ক্লিনজিং)।

এই বিষয়ে আল জাজিরার প্রশ্নের কোনো উত্তর দেয়নি ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।

অধ্যাপক মাইকেল বেকার বলেন, গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের স্থায়ীভাবে বিতাড়নের এই ধারণাটি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির শামিল এবং এটি ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন।" তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, আত্মনিয়ন্ত্রণের এই নীতিটি জাতিসংঘ সনদের একটি মূল ভিত্তি।

তবে বেকারের মতে, আন্তর্জাতিক মহলের মনোযোগ এখন গাজা সংকট থেকে সরে গিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার ইরান যুদ্ধ এবং লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের দিকে চলে গেছে, যেখানে ইসরায়েল লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের বিশাল এলাকা দখল করে নিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের শুরু করা ইরানের বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক ও অবৈধ যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো ইসরায়েলের স্বার্থের বাইরে গিয়ে কাজ করতে ইচ্ছুক হতে পারে, তবে গাজা নিয়ে কিংবা নেতানিয়াহু সরকারকে নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যাপারে আমেরিকার আগ্রহ ফুরিয়ে গেছে বলেই মনে হচ্ছে। ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় তথাকথিত 'বোর্ড অফ পিস' কী ভূমিকা পালন করবে, তাও এখন সম্পূর্ণ অস্পষ্ট।

সূত্র: আল জাজিরা

একে


Somoy Journal is new coming online based newspaper in Bangladesh. It's growing as a most reading and popular Bangladeshi and Bengali website in the world.

উপদেষ্টা সম্পাদক: প্রফেসর সৈয়দ আহসানুল আলম পারভেজ

যোগাযোগ:
এহসান টাওয়ার, লেন-১৬/১৭, পূর্বাচল রোড, উত্তর বাড্ডা, ঢাকা-১২১২, বাংলাদেশ
কর্পোরেট অফিস: ২২৯/ক, প্রগতি সরণি, কুড়িল, ঢাকা-১২২৯
ইমেইল: somoyjournal@gmail.com
নিউজরুম ই-মেইল : sjnewsdesk@gmail.com

কপিরাইট স্বত্ব ২০১৯-২০২৬ সময় জার্নাল