এহসান রানা , ফরিদপুর:
চুরির জবাবে প্রতিশোধ কিংবা আইনি লড়াইয়ের গল্প আমরা প্রতিনিয়ত শুনি। কিন্তু চুরির ক্ষোভ থেকে পুরো গ্রামকে ফুলের সুবাসে ভাসিয়ে দেওয়ার গল্প সচরাচর দেখা যায় না। এমনই এক ব্যতিক্রমী ও ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে এলাকায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের পূর্ব শ্যামপুর গ্রামের যুবক হাওলাদার শামীম আহমেদ।
যে ঘটনা থেকে এই উদ্যোগ:
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, কয়েক মাস আগে নিজের দাদি ও বাবার কবরের পাশে শখ করে হাসনাহেনা, কামিনী ও শিউলী—এই তিনটি ফুলগাছ রোপণ করেছিলেন শামীম। নিয়মিত পরিচর্যায় গাছগুলো বড় হয়ে ওঠে এবং একটি গাছে কাঙ্ক্ষিত ফুলও ফোটে। কিন্তু ফুল ফোটার পরদিন সকালে কবরস্থানে গিয়ে শামীম দেখেন, ফুটন্ত গাছসহ তিনটি ফুলগাছই উপড়ে নিয়ে গেছে কোনো চোর।
ক্ষোভের বদলে ভালোবাসার বিস্তার:
প্রিয়জনদের স্মৃতিবিজড়িত গাছ হারিয়ে প্রচণ্ড কষ্ট পেলেও চোরের প্রতি কোনো প্রতিহিংসা দেখাননি শামীম। তিনি ভিন্নভাবে ভাবলেন—যে ব্যক্তি গাছ চুরি করেছে, সে নিশ্চয়ই ফুলপ্রেমী! আর এই ভাবনা থেকেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, একটি বা দুটি নয়, পুরো এলাকাজুড়েই ফুলগাছ রোপণ করবেন।
এরপর তিনি নিজ উদ্যোগে ও নিজস্ব অর্থায়নে শ্রমিক নিয়োগ করেন। পূর্ব শ্যামপুর গ্রামের প্রায় দুই কিলোমিটার সড়কের দুই পাশের ৫০০টি বাড়ির সামনে তিনটি করে মোট ১ হাজার ৫০০টি ফুলগাছ রোপণ শুরু করেন। প্রতিটি বাড়ির সামনে রোপণ করা হয় চুরি হয়ে যাওয়া সেই তিন প্রজাতির গাছ—হাসনাহেনা, কামিনী ও শিউলী। দিনব্যাপী বাড়ি বাড়ি ঘুরে গাছ রোপণের পাশাপাশি স্থানীয়দের এগুলো পরিচর্যা করারও অনুরোধ জানান তিনি।
এলাকাবাসীর প্রতিক্রিয়া:
শামীমের এই অভিনব উদ্যোগে পুরো গ্রামজুড়ে বইছে প্রশংসার জোয়ার। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সাধারণত চুরির ঘটনায় মানুষ ক্ষুব্ধ হয়, কিন্তু শামীম যেভাবে নিজের ক্ষতিকে পুরো গ্রামের সৌন্দর্যে রূপান্তর করলেন, তা সত্যিই বিরল। কয়েক মাস পর যখন এই দেড় হাজার গাছে ফুল ফুটবে, তখন পুরো গ্রাম সুগন্ধে মুখরিত হয়ে উঠবে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা:
জানতে চাইলে হাওলাদার শামীম আহমেদ বলেন,
"আমি চোরকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করিনি। এই কর্মসূচির মাধ্যমে হয়তো চোরের বাড়িতেও আমার রোপণ করা গাছ পৌঁছে গেছে। সে যদি এই উদ্যোগ দেখে অনুতপ্ত হয় এবং ভবিষ্যতে আর এমন কাজ না করে, তাহলে সেটাই হবে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আমার লক্ষ্য শুধু চোরকে শিক্ষা দেওয়া নয়, বরং পুরো উপজেলাকে সবুজ ও সুবাসিত করা। ভবিষ্যতে সদরপুরের প্রতিটি গ্রামে ফুল ও ঔষধি গাছ রোপণের পরিকল্পনা রয়েছে আমার।"
অপরাধের জবাবে শামীমের এই 'ফুলের মারণাস্ত্র' সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ স্থানীয় সচেতন মহলে দারুণ প্রশংসিত হচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন, সমাজের যেকোনো নেতিবাচক ঘটনার এমন সুন্দর ও ইতিবাচক সমাধান তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি বড় অনুপ্রেরণা।
এমআই