সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬

শহরের বিষাক্ত বাতাসে বাড়ছে শ্বাসকষ্টের রোগী

সোমবার, জুন ৮, ২০২৬
শহরের বিষাক্ত বাতাসে বাড়ছে শ্বাসকষ্টের রোগী

ফকরুল মাহমুদ আনাম নূর:

শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই দিনের শুরুটা করতে চান নির্মল বাতাসে বুকভরা শ্বাস নিয়ে। কিন্তু বাস্তবতা এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। নগরজীবনের প্রতিটি নিঃশ্বাসের সঙ্গে যেন মিশে যাচ্ছে বিষাক্ত ধোঁয়া ও ধুলিকণা। বাতাসের বিষাক্ততার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শ্বাসকষ্টের রোগী, দীর্ঘ হচ্ছে নীরব এক মৃত্যুর মিছিল।

বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি জরিপে বহুবার উঠে এসেছে, বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর তালিকায় ঢাকার অবস্থান শীর্ষের দিকে। শুধু ঢাকা নয়, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা কিংবা বরিশালের মতো বড় শহরগুলোতেও দিন দিন বাড়ছে বায়ুদূষণ। অনেকে মনে করেন বর্ষা বা শীতকালে বায়ুদূষণ কমে যায়, কিন্তু সাম্প্রতিক জরিপগুলো বলছে ভিন্ন কথা। বছরের প্রায় পুরো সময়জুড়েই বাতাসে ক্ষতিকর উপাদানের মাত্রা আন্তর্জাতিক নিরাপদ সীমা অতিক্রম করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) নির্ধারিত নিরাপদ বায়ুমানের তুলনায় আমাদের শহরগুলোর বাতাসে দূষণের মাত্রা কয়েকগুণ বেশি।

দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ন, দুর্বল নীতিমালা এবং কার্যকর উদ্যোগের অভাবে দেশের বায়ুর মান দিন দিন আরও অবনতির দিকে যাচ্ছে। বায়ুদূষণের পেছনে একক কোনো কারণ নেই; বরং রয়েছে অসংখ্য মানবসৃষ্ট কারণ। বিভিন্ন মেগা প্রকল্প, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ, ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে, ব্রিজ ও রেললাইন নির্মাণকাজ থেকে প্রতিনিয়ত বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে বিপুল পরিমাণ ধুলিকণা। নির্মাণসামগ্রী বহনকারী ট্রাক থেকে শুরু করে খোলা জায়গায় বালু ও পাথর ফেলে রাখার কারণেও দূষণ বাড়ছে আশঙ্কাজনকভাবে।

ত্রুটিপূর্ণ ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন বায়ুদূষণের অন্যতম প্রধান কারণ। এসব যানবাহন থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া প্রতিনিয়ত পরিবেশকে বিষাক্ত করে তুলছে। এছাড়াও যত্রতত্র ইটভাটা নির্মাণ, শিল্পকারখানার ধোঁয়া, বর্জ্য পোড়ানো এবং প্লাস্টিক দহন বাতাসে ছড়িয়ে দিচ্ছে মারাত্মক ক্ষতিকর গ্যাস। বাতাসে বাড়ছে PM2.5 পার্টিকুলেট ম্যাটার, সালফার ডাই-অক্সাইড ও নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের মতো প্রাণঘাতী উপাদান। এসব সূক্ষ্ম ধুলিকণা খুব সহজেই মানুষের ফুসফুসে প্রবেশ করে শ্বাসতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

বায়ুদূষণের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশু ও বৃদ্ধরা। শিশুদের ফুসফুস পুরোপুরি বিকশিত হওয়ার আগেই তারা অ্যাজমা, ব্রঙ্কাইটিস ও বিভিন্ন শ্বাসতন্ত্রজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। অনেক নবজাতক শিশুর মধ্যেও দেখা দিচ্ছে শ্বাসকষ্টের জটিলতা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব রোগ থেকে পুরোপুরি সুস্থ হওয়া সম্ভব হয় না। ফলে তাদের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়। অন্য শিশুদের মতো তারা খেলাধুলা বা স্বাভাবিক শারীরিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারে না। অনেক শিশুকে ছোটবেলা থেকেই ইনহেলার কিংবা দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ওপর নির্ভর করতে হয়।

অন্যদিকে বৃদ্ধদের জন্য পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। ডায়াবেটিস, হৃদরোগ কিংবা উচ্চ রক্তচাপের মতো সমস্যার পাশাপাশি শ্বাসকষ্ট তাদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তোলে। অনেক বৃদ্ধ সামান্য হাঁটাচলা করতেও কষ্ট অনুভব করেন। কেউ কেউ পুরোপুরি বিছানায় পড়ে যান। ফলে পরিবারগুলোও মানসিক ও আর্থিক সংকটে পড়ে।

বায়ুদূষণের ক্ষতি এখন আর শুধু কাশি বা শ্বাসকষ্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন দূষিত বাতাসে থাকার ফলে ফুসফুসের ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোক এমনকি অকাল মৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়ছে। প্রতিদিনের বিষাক্ত বাতাস আমাদের শরীরকে ধীরে ধীরে ভেতর থেকে ক্ষয় করে দিচ্ছে। আমরা হয়তো বুঝতে পারছি না, কিন্তু প্রতিটি নিঃশ্বাসের সঙ্গে কমে যাচ্ছে আমাদের আয়ু।

দেশের হাসপাতালগুলোতেও প্রতিনিয়ত বাড়ছে শ্বাসকষ্টের রোগীর সংখ্যা। বহির্বিভাগে তাকালেই দেখা যায় অ্যাজমা, কাশি ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত রোগীদের দীর্ঘ সারি। এদের বড় একটি অংশ শিশু ও বৃদ্ধ। অনেকে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরলেও অনেককে ভর্তি হতে হয় হাসপাতালে। আবার অনেক রোগী বেড না পেয়ে বারান্দায় চিকিৎসা নিতে বাধ্য হন। কেউ কেউ পর্যাপ্ত চিকিৎসা বা জরুরি সেবা না পেয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। শ্বাসকষ্টজনিত চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় নিম্নআয়ের মানুষের পক্ষে নিয়মিত চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা বারবার বায়ুদূষণ রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানালেও বাস্তবে তার খুব কমই প্রতিফলন দেখা যায়। পরিবেশ রক্ষায় আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ নেই। ফলে দূষণকারী প্রতিষ্ঠান ও অসাধু গোষ্ঠীগুলো নির্বিঘ্নে পরিবেশ ধ্বংস করে চলেছে।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। প্রথমত, অপরিকল্পিত শিল্পকারখানা ও অবৈধ ইটভাটা বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। নির্মাণকাজে ধুলা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ফিটনেসবিহীন যানবাহন সড়কে চলাচল বন্ধ করতে হবে এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বর্জ্য পোড়ানো বন্ধে স্থানীয় প্রশাসনকে আরও সক্রিয় হতে হবে।

একই সঙ্গে সামাজিক সচেতনতাও অত্যন্ত জরুরি। বাইরে বের হলে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে এবং সবাইকে এ বিষয়ে সচেতন করতে হবে। পরিবেশ রক্ষায় গাছ লাগানোর বিকল্প নেই। শহরের খালি জায়গাগুলোতে বৃক্ষরোপণ, ছাদবাগান ও সবুজায়নের উদ্যোগ বাড়াতে হবে। উন্নত দেশগুলো যেভাবে পরিকল্পিত নগরায়ন ও কঠোর পরিবেশনীতি অনুসরণ করে দূষণ কমিয়েছে, সেসব অভিজ্ঞতা থেকেও আমাদের শিক্ষা নিতে হবে।

ইট-পাথর ও যান্ত্রিকতার এই নগরসভ্যতা আমাদের বাসযোগ্য পরিবেশ অনেক আগেই কেড়ে নিতে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নিরাপদ বায়ুর যে সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, আমরা তা বহু আগেই অতিক্রম করেছি। আজ আমরা প্রতিটি নিঃশ্বাসে অক্সিজেনের সঙ্গে বিষাক্ত ধোঁয়া ও ধুলিকণাও গ্রহণ করছি। এভাবে চলতে থাকলে একসময় আমাদের শহরগুলো মানুষের বসবাসের জন্য পুরোপুরি অনুপযোগী হয়ে পড়বে।

তাই এখনই সময় সচেতন হওয়ার। শুধু সরকারের উদ্যোগ নয়, ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ বিশুদ্ধ বাতাস কোনো বিলাসিতা নয়; এটি মানুষের মৌলিক অধিকার।

লেখক: ফকরুল মাহমুদ আনাম নূর, শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।


Somoy Journal is new coming online based newspaper in Bangladesh. It's growing as a most reading and popular Bangladeshi and Bengali website in the world.

উপদেষ্টা সম্পাদক: প্রফেসর সৈয়দ আহসানুল আলম পারভেজ

যোগাযোগ:
এহসান টাওয়ার, লেন-১৬/১৭, পূর্বাচল রোড, উত্তর বাড্ডা, ঢাকা-১২১২, বাংলাদেশ
কর্পোরেট অফিস: ২২৯/ক, প্রগতি সরণি, কুড়িল, ঢাকা-১২২৯
ইমেইল: somoyjournal@gmail.com
নিউজরুম ই-মেইল : sjnewsdesk@gmail.com

কপিরাইট স্বত্ব ২০১৯-২০২৬ সময় জার্নাল