ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম:
আমাদের সময় এসেছে একটু খোলামেলা কথা বলার।
ঢাকায় মন্ত্রীদের জন্য প্রায় এক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে রাজপ্রাসাদসদৃশ আবাসন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন ৮ হাজার ৫০০ থেকে ৯ হাজার ৩০ বর্গফুট। থাকবে সুইমিংপুল, জিম, কমিউনিটি স্পেস—সব মিলিয়ে রাজকীয় সব সুযোগ-সুবিধা।
এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে একটি খুব সাধারণ প্রশ্ন ওঠে—এই অনুমতি সরকারকে কে দিয়েছে?
ঠিক এই সময়েই উত্তরায় একটি ভবনে আগুন লেগে মানুষ বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে বাঁচার আকুতি জানিয়েছিল। কিন্তু তাঁদের উদ্ধার করার মতো কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। ভবন এমনভাবে নির্মিত, যেন সেটাই একেকটা মৃত্যুপুরী। আমেরিকা বা ইউরোপ থেকে উদ্ধারকর্মী এলেও হয়তো কিছু করার ছিল না।
এই রকম ভবনেই ঢাকা শহরের লাখো মানুষ বাস করেন।
তাহলে প্রশ্নটা আরও তীব্র হয়—
মন্ত্রীদের জন্য রাজপ্রাসাদ হবে, আর সাধারণ মানুষের জন্য থাকবে আগুনে পুড়ে মরার ভবন?
মন্ত্রী কি মানুষ, আর বাকি সবাই কি কম মানুষ?
জনগণ ট্যাক্স দেবে, আর সেই ট্যাক্সের টাকায় মন্ত্রী ও এমপিরা বিলাসী জীবন যাপন করবেন—এই অবিচার আর কতকাল চলবে?
সরকারি হিসাব বলছে, ঢাকায় মন্ত্রীদের জন্য ইতিমধ্যেই ৭১টি বাংলো ও ফ্ল্যাট চিহ্নিত আছে। গুলশান, ধানমন্ডি, বেইলি রোড, মিন্টো রোড—সব জায়গাতেই আবাসনের ব্যবস্থা রয়েছে। এমনকি অনেক ফ্ল্যাট খালিও আছে। তার পরও কেন নতুন করে আরও ৭২টি বিশাল আকৃতির ফ্ল্যাট নির্মাণের প্রয়োজন পড়ছে?
সূত্র বলছে, এই প্রকল্পে বেশি আগ্রহী আমলারা। নতুন ভবনে মন্ত্রীরা উঠলে, পুরোনো বড় ফ্ল্যাটে উঠবেন আমলারা। অর্থাৎ রাজকীয় আবাসনের এই চক্র থামছেই না।
অন্যদিকে, রাজধানীর উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবার যেখানে দেড় হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাটে থাকে, সেখানে মন্ত্রীদের ফ্ল্যাট হবে তার প্রায় ছয় গুণ। আর সরকারের নিম্নপদের কর্মচারীরা যেখানে ৬৫০ বর্গফুটের বাসা পান, সেখানে এই ফ্ল্যাট হবে ১৪ গুণ বড়।
এই বৈষম্য কি কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মানানসই?
আরও গুরুতর প্রশ্ন আছে। একই কমপ্লেক্সে মন্ত্রী, আমলা, বিচারপতি ও সাংবিধানিক সংস্থার প্রধানদের বসবাস—এটা কি নৈতিক? আইনগত বাধা না থাকলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি ক্ষমতার পৃথকীকরণ ও সুশাসনের জন্য বড় হুমকি।
এই সবকিছু ঘটছে এমন এক সময়ে, যখন দেশ উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে জর্জরিত। রাজস্ব ঘাটতি প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংক একীভূত করতে হাজার হাজার কোটি টাকা দরকার। কর্মসংস্থান সংকট তীব্র। বিশ্বব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ বলছেন—
“ঘাড় তো আগে থেকেই ভাঙা, আর কত বোঝা নেবে?”
এই প্রেক্ষাপটে মন্ত্রীদের জন্য সুইমিংপুলসহ রাজপ্রাসাদ নির্মাণ কি যুক্তিসংগত?
আজ বাদে কাল নির্বাচন। আপনার কাছে যাঁরা ভোট চাইতে আসবেন, আপনি তাঁদের একটি প্রশ্ন করুন—
নির্বাচিত হওয়ার পর আপনি জনগণের জন্য কী করবেন?
আরেকটা প্রশ্ন করুন—
এই মন্ত্রীপাড়া নির্মাণ প্রকল্প বন্ধ করবেন কি না?
আমরা ভোট দিয়ে রাজা বানাতে চাই না।
আমরা এমন প্রতিনিধি চাই, যিনি সাধারণ মানুষের মতোই এই শহরে বাস করতে পারবেন।
আমি স্পষ্টভাবে দাবি জানাচ্ছি—
মন্ত্রী ও এমপিদের জন্য কোটাভিত্তিক রাজকীয় আবাসন বন্ধ করতে হবে।
জনগণের ট্যাক্সের টাকা জনগণের নিরাপত্তা, বাসযোগ্য শহর ও জীবন রক্ষায় ব্যয় করতে হবে।
এটাই হোক এই নির্বাচনের অন্যতম ম্যান্ডেট।
লেখক : ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম, কলামিষ্ট, সমাজ সেবক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, মানবাধিকার কর্মী ও রাজনীতিবিদ।
চেয়ারম্যান -বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গবেষণা কেন্দ্র, চেয়ারম্যান - সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট
চেয়ারম্যান - ডেমোক্রেসি রিসার্চ সেন্টার (ডিআরসি)