হেনা শিকদার:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের লেলিহান শিখা যখন স্তিমিত হয়ে এল, তখন বিধ্বস্ত বিশ্ব অর্থনীতিকে জোড়া তালি দিতে ১৯৪৪ সালে আমেরিকার নিউ হ্যাম্পশায়ারের এক নিরিবিলি শহর ব্র্যাটন উডসে মিলিত হয়েছিলেন বিশ্বের তাবড় সব অর্থনীতিবিদ। সেই সম্মেলনের গর্ভ থেকেই জন্ম নিয়েছিল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং বিশ্বব্যাংক। আট দশক পেরিয়ে আজও এই প্রতিষ্ঠান দুটি বিশ্ব অর্থনীতির অঘোষিত অভিভাবক। তবে এই অভিভাবকত্ব নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। একদল মনে করেন, সংকটে তারা ত্রাতা; অন্যদলের মতে, তারা উন্নত বিশ্বের এমন এক হাতিয়ার যা ঋণের মোড়কে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সার্বভৌমত্বকে গিলে খায়। প্রশ্নটি তাই অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক— এই প্রতিষ্ঠানগুলো কি সত্যিই উন্নয়নের কারিগর, নাকি সুনিপুণভাবে পাতা এক ঋণের ফাঁদ?
উন্নয়নের বয়ানটি যদি আমরা বিশ্লেষণ করি, তবে দেখা যায় আইএমএফ মূলত কাজ করে বিশ্বের 'অর্থনৈতিক অগ্নিনির্বাপক' হিসেবে। কোনো দেশ যখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হারিয়ে দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয় কিংবা আমদানির বিল মেটাতে হিমশিম খায়, তখন আইএমএফ-ই প্রথম হাত বাড়িয়ে দেয়। তাদের দেওয়া ঋণ তাৎক্ষণিকভাবে বাজারের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনে এবং অন্যান্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বার্তা দেয় যে দেশটি সংস্কারের পথে আছে। অন্যদিকে, বিশ্বব্যাংক দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের মাধ্যমে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণে অর্থায়ন করে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর পদ্মা সেতু থেকে শুরু করে গ্রামীণ জনপদের বিদ্যুতায়ন— অনেক ক্ষেত্রেই এসব প্রতিষ্ঠানের অর্থ ও কারিগরি সহায়তার একটা বড় ভূমিকা রয়েছে। তারা কেবল টাকা দেয় না, বরং আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং সুশাসনের কিছু মানদণ্ডও শিখিয়ে দেয়, যা অনেক ক্ষেত্রে একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য।
কিন্তু এই মুদ্রার ওপিঠটি বেশ অন্ধকার এবং জটিল। সমালোচকদের প্রধান আপত্তির জায়গা হলো প্রতিষ্ঠান দুটির ঋণের সাথে জুড়ে দেওয়া 'কঠোর শর্তাবলি'। একে বলা হয় 'স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট প্রোগ্রাম' বা কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচি। আইএমএফ যখন ঋণ দেয়, তখন তারা সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারকে ভর্তুকি কমানো, কর বাড়ানো এবং সরকারি ব্যয় সংকোচনের মতো কঠোর দাওয়াই দেয়। আপাতদৃষ্টিতে এসব সংস্কার যুক্তিযুক্ত মনে হলেও, এর চূড়ান্ত প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। তেলের দাম বা বিদ্যুতের দাম হঠাৎ বেড়ে গেলে দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষগুলোর নাভিশ্বাস ওঠে। অনেক সময় দেখা যায়, উন্নয়নের নামে নেওয়া ঋণের কিস্তি শোধ করতেই দেশের বাজেটের সিংহভাগ চলে যায়, ফলে নিজস্ব শিক্ষা বা স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেওয়ার মতো অর্থ আর অবশিষ্ট থাকে না। এভাবেই একটি দেশ ঋণের এক অন্তহীন চক্রে বা 'ফাঁদে' আটকে পড়ে।
আরও গভীরে গেলে দেখা যায় এক ধরণের নব্য-উপনিবেশবাদী প্রভাব। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ভোটিং ক্ষমতা বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া মূলত ধনী দেশগুলোর, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে। ফলে এই প্রতিষ্ঠানগুলো যখন কোনো দেশের ওপর নীতি চাপিয়ে দেয়, তখন সেখানে অনেক সময় দাতা দেশগুলোর বাণিজ্যিক স্বার্থ প্রাধান্য পায়। বাজার উন্মুক্ত করে দেওয়া বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বেসরকারীকরণের শর্ত দিয়ে অনেক সময় বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ব্যবসার পথ প্রশস্ত করে দেওয়া হয়। এতে স্থানীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দেশটি অর্থনৈতিকভাবে আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। অনেক অর্থনীতিবিদের মতে, এই প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নয়নের যে মডেল প্রচার করে, তা অনেকটা 'সবার জন্য এক জুতো'র মতো— যা সব দেশের সংস্কৃতি বা স্থানীয় বাস্তবতায় খাপ খায় না।
আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংক আসলে কোনো পরম বন্ধুও নয়, আবার কেবল রক্তচোষা মহাজনও নয়। তারা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের এক শক্তিশালী অংশীদার। একটি দেশ তাদের ঋণের ফাঁদে পড়বে নাকি সেই ঋণকে উন্নয়নের সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে সেই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং দরকষাকষির ক্ষমতার ওপর। নিজস্ব সক্ষমতা না বাড়িয়ে কেবল ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লে ফাঁদ অনিবার্য। অন্যদিকে, যদি অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিশ্চিত করে ঋণের সঠিক ব্যবহার করা যায়, তবে তা আশীর্বাদও হতে পারে। দিনশেষে, মুক্তির চাবিকাঠি দাতা সংস্থার প্রেসক্রিপশনে নয়, বরং দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক দূরদর্শিতার মধ্যেই নিহিত থাকে।
লেখক: হেনা শিকদার,
দর্শন বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।