মুহা: জিললুর রহমান, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি:
লেবাননে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ধুলিহর ইউনিয়নের ভালুকা চাঁদপুর গ্রামের শফিকুল ইসলাম (৩৮) এবং আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি গ্রামের মো. নাহিদুল ইসলাম নাহিদ (২৬) এর বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। নাহিদুল ও শফিকুলের বাড়িতে কান্নার রোল পড়েছে। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে আশপাশের বাতাস। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ বাবা-মা।
নিহতদের মধ্যে শফিকুল ইসলাম সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ভালুকা চাঁদপুর গ্রামের আফসার আলীর একমাত্র ছেলে এবং নাহিদুল ইসলাম নাহিদ আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি গ্রামের আব্দুল কাদেরের ছেলে।
তাদের নিহত হওয়ার খবর শুনে সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অর্ণব দত্ত ভালুকা চাঁদপুর গ্রামে নিহত শফিকুলের বাড়িতে যান এবং আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শ্যামা নন্দ কুন্ডু কাদাকাটি গ্রামে নিহত নাহিদুল ইসলামের বাড়িতে যান। এসময় জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তারা দু’জনেরই মৃতদেহ দেশে আনার জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানানো হয়।
নিহতদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে মাসখানেক আগেই তাঁরা লেবাননে পাড়ি জমিয়েছিলেন। কিন্তু পরিবারের সুদিন ফেরানোর লড়াই শুরুর আগেই এভাবে তাদের চলে যাওয়া কেউ মেনে নিতে পারছেন না।
শফিকুলের প্রতিবেশী ও ভালুকা চাঁদপুর মডেল হাইস্কুলের শিক্ষক আল কালাম আবু ওয়াহিদ জানান, গত ২০ রমজান অনেক স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে গিয়েছিলেন শফিকুল। তিনি মা-বাবার একমাত্র সন্তান ছিলেন।
নিহত শফিকুলের মামা নজির উদ্দিন জানান, আমাদের একটাই দাবি যাতে দ্রুত মরদেহ লেবানন থেকে দেশে আনা হয় । তাসলিমা ও বৃষ্টি নামে তার দুটি মেয়ে রয়েছে। ঋণ নিয়ে ভাগ্য ফেরানোর আশায় সে বিদেশে যায়। ঋনগুলো মাফ করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান তিনি।
ধুলিহর ইউপি চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান চৌধুরী বলেন, পরিবার দুটি অত্যন্ত অসহায়। ঋণ করে সন্তানদের বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। সন্তান হারিয়ে তাঁরা অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে গেছেন।
এদিকে, সমবেদনা জানাতে মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে সদর উপজেলার ধুলিহর ইউনিয়নের ভালুকা চাঁদপুর গ্রামের শফিকুল ইসলামের বাড়িতে যান সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অর্ণব দত্ত। এসময় তিনি পরিবারটিকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাসও দেন।
এসময় নির্বাহী কর্মকর্তা অর্ণব দত্ত জানান, লেবাননে নিহত যুবকের মরদেহ দেশে আনার জন্য সরকারিভাবে সব ধরনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তাদের মরদেহ দেশে আনার জন্য উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে লেবাননে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। নিহতের পরিবারের জন্য সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসন ও সদর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। তার যে সমস্ত ঋণ গুলো রয়েছে তা মওকুফ করার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সাথে কথা বলে যতটুকু করা সম্ভব আমরা করার চেষ্টা করব।
এদিকে আশাশুনির কাদাকাটি গ্রামের আব্দুল কাদেরের ছেলে নাহিদুল ইসলাম নাহিদ এর বাড়িতে কান্নার রোল পড়েছে। মাত্র ২১ বছরের যুবক নাহিদ। বাবা মা ঋণ করে তাকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন সংসারের স্বচ্ছলতা ফেরাতে। পরে ঋণের চাপে বাবা মা ঢাকায় গার্মেন্টসে কাজ নিয়ে সেখানে থাকেন। ছোট ভাই স্থানীয় কাদাকাটি স্কুলে অষ্টম শেণীতে পড়ে।
নিহত নাহিদুল ইসলামের পিতা আব্দুল কাদের বলেন, ঋন করে ভাগ্য ফেরানোর আশায় তারা ছেলেকে বিদেশ পাঠান। ঋণের চাপে তারা চলে যান ঢাকায় গার্মেন্টসে চাকরি করার জন্য। মঙ্গলবার সকালে তারা ছেলে নিহত হওয়ার খবর শুনেতে পান। পরে ঢাকা থেকে দুপুরে তারা বাড়িতে এসেছেন। একদিকে সন্তান হারানোর বেদনা অন্যদিকে ঋণের বোঝা নিয়ে বিপাকে আছেন তিনি।
আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শ্যামা নন্দ কুন্ডু বেলা ১২ টার দিকে নিহত নাহিদের বাড়িতে যান। সেখানে তিনি নিহতের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং প্রশাসন তাদের পাশে থাকবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি জানান ইতোমধ্যে নিহতদের মরদেহ আনার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তর গুলোতে যোগাযোগ শুরু করা হয়েছে।
এদিকে ঋণের বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতের পরিবারগুলোকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে বলে জানান উভয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।
এমআই