লাবনী আক্তার কবিতা:পড়াশোনা মানে শুধুই বইয়ের পড়া মুখস্থ করা নয় বরং এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে মানুষ জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ ও চিন্তাশক্তি অর্জন করে। পড়াশোনা মানে কখনোই এমন হওয়া উচিত নয়, যে আপনি কোনো টপিক পড়লেন, মুখস্থ করলেন, বুঝলেন, পরীক্ষার খাতায় লিখে এ প্লাস পেলেন। বরং পড়াশোনা এমন হওয়া উচিত যাতে আপনি যা পড়লেন, তা বুঝলেন, বিশ্লেষণ করলেন এবং জীবনে প্রয়োগ করলেন। কিন্তু আফসোসের সাথে বলতে হয়, এখন পড়াশোনার গন্ডি শুধু মুখস্থ অব্দি সীমাবদ্ধ। জ্ঞান আহরণের ইচ্ছা কারো মধ্যেই নেই। উন্নত কিছু দেশে পড়াশোনার মান খুব ভালো থাকলেও বাংলাদেশের পড়াশোনার মান যেন একবারেই নিম্ন।
যদি আমাদের দেশের পড়াশোনাকে বিশ্লেষণ করা হয় তবে দেখা যায়,আমাদের দেশে মূলত দুই ধরনের পড়াশোনা হয়ে থাকে। এক, একাডেমিক পড়াশোনা: যা স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলক ভাবে শিখানো হয়। যেমন গণিত, বিজ্ঞান, ইতিহাস, সাহিত্য ইত্যাদি। দুই, নন-একাডেমিক পড়াশোনা : যা আমরা নিজের ইচ্ছায় অথবা কোনো ক্লাবের মাধ্যমে শিখি। যেমন: বই পড়া, বিতর্ক করা ইত্যাদি। পড়াশোনা যেই ধরনেরই হোক তার মূল লক্ষ্যই থাকে মানুষের জ্ঞান বৃদ্ধি করা, চিন্তাশক্তি বাড়ানো, এবং নতুন কিছুর উদ্বোধন। কিন্তু বর্তমানে এরকম কিছু লক্ষ্য করা কঠিন।
উল্টো দিনে দিনে আমাদের দেশের তরুণদের মধ্যে পড়াশোনার প্রতি অনাগ্রহ দেখা যায়। কারন আমাদের দেশে পড়াশোনার মান এতোটাই খারাপ হয়ে গেছে যে,এখন পড়াশোনাকে শুধু চাকরীর হাতিয়ার হিসেবেই দেখা হয়।মুখস্থভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা, সৃজনশীলতা ও সমালোচনামূলক চিন্তার অভাব। ভালো শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জন করেও দেশে বেকারত্ব বৃদ্ধি, সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুধু টাকাকেই সফলতার মাপকাঠি হিসেবে দেখা, এই ধরনের সকল কারনে দেশের তরুণ প্রজন্ম শিক্ষা বিমুখ হয়ে যাচ্ছে। একজন তরুণ যখন দেখে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেও সে কোনো চাকরী পাচ্ছে না,টাকার জন্য পরিবারের বোঝা হয়ে যাবে অপরদিকে কিছু সস্তা কনটেন্ট ক্রিয়েটর সহজেই টাকা কামাতে পারছে, অথবা যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও কেউ লবিং করে চাকরী পাচ্ছে তখন ডিপ্রেশনে যাওয়া বা পড়ালেখার প্রতি বিমুখ হওয়া সেই তরুনদের জন্য স্বাভাবিক বিষয়।
ফলে দেখা যাচ্ছে এই রকমের বিভিন্ন কারনে বর্তমান তরুণ প্রজন্মের মধ্যে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে এখন দুই ধরনের পড়াশোনার প্রবনতা লক্ষ্য করা যায়। একটি অংশ যা উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান, তারা পড়াশোনাকে জীবনের উন্নতি হাতিয়ার মনে করছে, পড়া মুখস্থ করে একটা চাকরি পেলেই জীবনে সফলতা অর্জন সম্ভব। অন্য একটি বড় অংশ যারা মনে করে পড়াশোনা করে ডিগ্রি পেলেও চাকরি বা সাফল্যের নিশ্চয়তা নেই। ফলে তারা বিকল্প পথ যেমন অনলাইন ব্যবসা, ফ্রিল্যান্সিং, সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার হওয়া, বা বিদেশে যাওয়ার চিন্তা বেছে নিচ্ছে।
উপরের দুই ধরনের চিন্তাভাবনাই ভুল এবং দেশের জন্য ক্ষতিকর। প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা পড়াশোনাকে শুধুমাত্র মুখস্থ বিদ্যা হিসেবে ধরে নিয়েছে, ফলে এটি তাদের দীর্ঘস্থায়ী কোনো কাজেই দিচ্ছে না এবং দেশেরও কোনো উপকারে আসছে না, অথচ দেশের লক্ষ লক্ষ চাকরিপ্রার্থীদের হাজারো সময় এই মুখস্থ করার পিছনে নষ্ট হচ্ছে।
আর দ্বিতীয় শ্রেণির চিন্তাভাবনা আপাতত দৃষ্টিতে সঠিক মনে হলে এটিও দুশ্চিন্তার কারন। তারা আত্মনির্ভরশীল বা উদ্যোক্তা হচ্ছে ঠিকই কিন্তু সুশিক্ষিত হচ্ছে না।তারা টাকা কামানো কেই জীবনের সফলতা মনে করছে। যদি কোনো জাতির অর্ধেক তরুণ শুধুমাত্র টাকা কামানো কেই জীবনের সফলতা মনে করে এবং পড়াশোনা কে অবহেলা করে তখন সেই দেশ অবনতির দিকে ধাবিত হয়।
যদি এই অবস্থা চলমান থাকে তবে একসময় দেখা যাবে দেশে স্কুল থাকবে ঠিকই কিন্তু সেখানে পড়ার মতো শিক্ষার্থী পাওয়া যাবে না। তাই সরকারের উচিত দ্রুত শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কার করা। সরকারের একথা মাথায় রাখা উচিত যে, শুধুমাত্র উন্নত স্কুল অবকাঠামো দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নত করবে না, তারজন্য প্রয়োজন শিক্ষাব্যবস্থার ভিতরে পরিবর্তন করতে হবে।
লাবনী আক্তার কবিতা,
শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
সময় জার্নাল/একে