আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি শুক্রবার রাতে ইসলামাবাদে পৌঁছেছেন। এর আগে পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র যে প্রস্তাবগুলো তেহরানের কাছে পাঠিয়েছিল, তার আনুষ্ঠানিক জবাব তিনি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন। একই সময়ে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হয়েছে। মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ ও জারেড কুশনারও ইসলামাবাদ সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে এর মধ্যেও দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি আলোচনার সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চিত। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়ে দিয়েছে, সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার কোনো সুনির্দিষ্ট শিডিউল নেই। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতি অনুযায়ী, ইসলামাবাদে পৌঁছানোর পর আরাঘচিকে স্বাগত জানান উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার, চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস ফিল্ড মার্শাল অসিম মুনির। এতে বোঝা যায়, পাকিস্তান এই সফরকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, এই সফরের সময় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাকিস্তানের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করবেন, যেখানে সর্বশেষ আঞ্চলিক পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা হবে। এই সফরটি এমন এক সংবেদনশীল সময়ে হচ্ছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান অচলাবস্থার মধ্যে একটি নাজুক যুদ্ধবিরতি কাগজে-কলমে কার্যকর রয়েছে। কিন্তু নৌ অবরোধ, পারমাণবিক সীমাবদ্ধতা এবং ছাড় দেয়ার ধাপ নির্ধারণের মতো মূল বিরোধগুলো এখনো অমীমাংসিত।
তেহরান থেকে তিন দেশ সফরে (ওমান ও রাশিয়াও অন্তর্ভুক্ত) রওনা হওয়ার আগে এক্সে দেয়া পোস্টে আরাঘচি বলেন, আমার এই সফরের উদ্দেশ্য হলো দ্বিপাক্ষিক বিষয়গুলোতে অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় করা এবং আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে পরামর্শ করা। আমাদের প্রতিবেশীরাই আমাদের অগ্রাধিকার। পাকিস্তানি কর্মকর্তারা জানান, এই সফরের মূল উদ্দেশ্য হলো অভ্যন্তরীণ আলোচনার পর তেহরানের চূড়ান্ত অবস্থান জানানো। গত সপ্তাহে ফিল্ড মার্শাল মুনির তেহরান সফরের সময় ওয়াশিংটনের বার্তা পৌঁছে দেন, যা পাকিস্তানের মধ্যস্থতার অংশ ছিল।
সফরের আগে কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার হয়। আরাঘচি আলাদাভাবে ইসহাক দার ও অসিম মুনিরের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। সেখানে যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ইসহাক দার অমীমাংসিত বিষয়গুলো সমাধানে ধারাবাহিক সংলাপ ও সম্পৃক্ততার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
এই আলোচনার পর পাকিস্তান সরকারসূত্র জানায়, ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফা আলোচনা হতে পারে এবং তার প্রস্তুতিও নীরবে এগিয়ে চলছে। এমনকি একটি মার্কিন অগ্রবর্তী দল ইতিমধ্যেই উপস্থিত রয়েছে। তবে তেহরানের পক্ষ থেকে সতর্ক বার্তা এসেছে। এক ইরানি কর্মকর্তা জানান, ইরানের শর্ত পূরণ না হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা শুরু হবে না। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নেয়া, যা তেহরানের মতে অর্থবহ সংলাপের পূর্বশর্ত। আরাঘচি রাশিয়াকেও সফরসূচিতে রাখায় মস্কোর ভূমিকা আলোচনায় আসে। এদিন ইসহাক দার রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের সঙ্গেও কথা বলেন। পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, ল্যাভরভ ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংলাপে পাকিস্তানের গঠনমূলক ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। ইসহাক দার বলেন, সব সমস্যার সমাধানে সংলাপ ও কূটনীতির প্রচেষ্টায় পাকিস্তান অবদান রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
পরে হোয়াইট হাউস নিশ্চিত করে যে স্টিভ উইটকফ ও জারেড কুশনার ইসলামাবাদে এসে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আলোচনায় অংশ নেবেন। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট বলেন, ইরানিরাই সরাসরি আলোচনার অনুরোধ জানিয়েছে। তাই প্রেসিডেন্ট স্টিভ ও জারেডকে পাঠাচ্ছেন তাদের বক্তব্য শোনার জন্য। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আপাতত এই সফরে যোগ দিচ্ছেন না। কারণ তার ইরানি সমপর্যায়ের নেতা পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ উপস্থিত থাকছেন না। তারা বলেন, আলোচনায় অগ্রগতি হলে ভ্যান্স পরে যোগ দিতে পারেন। আর তার দলের সদস্যরা ইসলামাবাদে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। এই সব কূটনৈতিক তৎপরতার পরও সরাসরি মুখোমুখি বৈঠক হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ইরান বারবার বলেছে, চাপের মুখে বিশেষ করে চলমান সামুদ্রিক অবরোধ ও জাহাজ জব্দের ঘটনায় তারা আলোচনায় বসবে না।
এদিন মার্কিন গণমাধ্যমে খবর আসে, প্রধান ইরানি আলোচক বাঘের গালিবাফ আলোচনার কৌশল নিয়ে মতবিরোধের কারণে পদত্যাগ করেছেন। তবে কয়েক ঘণ্টা পর ইরানি পার্লামেন্ট এই খবর অস্বীকার করে জানায়, তিনি পদত্যাগ করেননি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার সূচি নির্ধারিত না হওয়ায় পাকিস্তানে যাননি। বর্তমান পর্যায়টি ১১ ও ১২ এপ্রিল ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত প্রথম দফা সরাসরি আলোচনার পর শুরু হয়েছে, যা ২০ ঘণ্টার বেশি সময় চললেও কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়, তবে কূটনৈতিক যোগাযোগ চালু রাখে। এরপর থেকে পাকিস্তানের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে, যেখানে উভয় পক্ষ নিজেদের অবস্থান সামঞ্জস্য করার চেষ্টা করছে, তবে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পরিস্থিতি এড়িয়ে চলছে।
এমআই